মেনড্যাক্স’র ব্যারিস্টার অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন, এমনভাবে মামলার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন যেন এটা কোটি টাকার মামলা। শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ার, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রেরই নজির তিনি ঘেঁটে দেখেননি, সেইসাথে পশ্চিমা-ধাঁচের গণতন্ত্র আছে পৃথিবীর এমন অন্যান্য দেশগুলোরও নজির তিনি ঘেঁটে দেখেছেন। তিনি কম্পিউটার বিষয়ক অপরাধ নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করে ফেলেছেন। অবশেষে তিনি আইন, দর্শন এবং ভাষাতত্ত্বের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কসূত্রটি ধরতে পেরেছেন যেখানে পৌঁছাতে গুটিকয়েক আইনজীবিই তাদের সমস্ত কর্মজীবনকে উৎসর্গ করেন।

কিন্তু তিনি কোথায়? গ্যালবালি তাঁর মোবাইল বের করলেন এবং তাঁর অফিসে খোঁজ নিলেন যেটা দেখতে মনে হল যেন তিনি মিনিটে পাঁচবার করে করছেন। যে খবর তিনি পেলেন তা সম্পূর্ণই নেতিবাচক। দ্বিতীয়-ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁকে বলা হল যে, ব্যারিস্টার অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি আদালতে যেত পারবেন না।

গ্যালবালি’র মনে হল যেন তাঁর বয়স একদিনে হঠাৎ বেড়ে গেছে।

যখন আদালত বসলো, তখন গ্যালবালিকে দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে প্রবীণ তিনজন বিচারককে ব্যাখ্যা করতে হলো যেন আসামীপক্ষের দুই-দিন সময় প্রয়োজন। আগাগোড়াই পেশাদার, জিওফ শেটল সেটাকে সমর্থন করলেন। তবুও, এই অনুরোধটা বেশ কঠিন। সুপ্রীম কোর্টে’র সময় অত্যন্ত দুর্লভ এবং মূল্যবান জিনিস। সৌভাগ্যবশত, বিরতির অনুরোধ গৃহীত হল।

এতে গ্যালবালি একজন ভালো ব্যারিস্টার খুঁজে বের করার জন্য মাত্র দুটি দিন পেলেন, যিনি এই মুহূর্তে ফাঁকা আছে এবং এই বিপুল পরিমাণ টেকনিক্যাল বিষয়াশয় অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে গুছিয়ে নেওয়ার মতো চৌকস। তিনি এন্ড্রু টিনেকে খুঁজে পেলেন।

টিনে ঘড়ি ধরে কাজ করতেন এবং ২ অক্টোবর, বুধবারে তিনি ফাঁকাই ছিলেন। আবারো, আইনজীবিগণ, এবং হ্যাকার, আদালতে হাজির হলেন।

তবে, এইবার, বিচারকরা সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরতে উদ্যত হলেন। তাঁরা উভয়পক্ষকেই প্রথম একঘন্টার মাঝে ব্যাখ্যা করতে বলরেন যে, কেন সুপ্রীম কোর্ট তাঁদের মামলাটি আমলে নিবে। আইনজীবিগণ একে অপরের দিকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকালেন। এসবের মানে কী?

উভয়পক্ষ থেকেই সংক্ষিপ্ত যুক্তিতর্ক শোনার পর, বিচারকগণ তাঁদের মতামত গ্রহণের জন্য সময় নিলেন। যখন তাঁরা ফিরে এলেন, বিচারপতি হাইন যে রায়টির আদ্যোপান্ত পড়লেন, সংক্ষেপে তার অর্থ হল, বিচারকগণ মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন।

বিচারকেরা যা বললেন, তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল যে সুপ্রীম কোর্টের বিচারকগণ শুধুমাত্র এই মামলাটিই খারিজ করলেন না; তারা মূলত এই ধরণের সকল ভবিষ্যত মামরাও খারিজ করে দিলেন। কম্পিউটার সংক্রান্ত কোনো অপরাধ বিষয়ে কোনো মামলা নয়। খুনের জন্য কোনো মামলা নয়। জালিয়াতির জন্য নয়। কোনোকিছুর জন্যই নয়। কাউন্টি কোর্টের বিচারকদের তারা এই বার্তাই দিলেন: ব্যতিক্রম কিছু না থাকলে আমাদের কাছে কোনো মামলা পাঠিও না।

জিওফ শেটল মুখে হাত দিয়ে চেয়ারে এলিয়ে পড়লেন। পল গ্যালবালি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এন্ড্রু টিনেকে দেখে মনে হল তিনি এক্ষুনি চেয়ার থেকে উঠে চেঁচিয়ে বলবেন, ‘গত দুইদনি ধরে আমি এই মামলার পেছনে জীবনপাত করছি! আপনাদের এটা শুনতে হবে!’ এমনকি এই মামলায় আন্দ্রে পাভেলকা’র বদলে আসা শান্তশিষ্ট লেসলি টেলর, যিনি কিনা অচঞ্চল এবং দুর্বোধ্য ডিপিপি আইনজীবি হিসেবে পরিচিত, তিনি পর্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলেন।

এই নির্দেশের বহুভাবে প্রভাব বিস্তার করবে। এর ফলে আইনগত কোনো বিষয়ের জটিলতা নিরসনের জন্য নিম্ন আদালতের বিচারকেরা এখন থেকে সুপ্রীম কোর্টে মামলা পাঠাতে ইতস্তত বোধ করবেন। মেনড্যাক্স আইনের জগতে ইতিহাস তৈরি করে ফেলেছে, কিন্তু, যেভাবে সে চেয়েছিল সেভাবে নয়।

মেনড্যাক্স’র মামলা আমার কাউন্টি কোর্টে ফিরে গেল।

সে তার মামলাটাকে পূর্ণাঙ্গ শুনানি অবধি নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু সম্প্রতি ঘোষিত বাজেট কর্তনের তালে পড়ে, সে বুঝতে পেরেছিল তার অভিযোগ নিয়ে লড়াই করার আশা দূরাশা। এই কর্তনের ফলে দরিদ্র লোকজন তাদের দোষ স্বীকারে বাধ্য হচ্ছিল, ফলে ন্যায়বিচার শুধুমাত্র বড়লোকদের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছিল। তারচেয়েও ভয়ংকর কথা হল, তার এই দোষ স্বীকার করার ফল যে শুধুমাত্র তার মামলা নয়, বরং হ্যাকিং সংক্রান্ত ভবিষ্যতের যাবতীয় মামলাতেই পড়তে যাচ্ছে সে বিষয়েও সে আঁচ করতে পেরেছিল। আইনগত বিষয়ের পরিষ্কার ব্যাখ্যা না হলে – যেটা বিচারকেরা প্রদান করতে রাজি হলেন না – বা কোনো যুগান্তকারী মামলার জুরিদের কোনো বার্তা না পেলে, যেমন, ওয়ান্ডি’র মামলার ক্ষেত্রে হয়েছিল, মেনড্যাক্স’র ধারণা হ্যাকারদের, পুলিশ বা আদালত কোনো পক্ষের কাছ থেকেই ভবিষ্যতে ন্যায়বিচার পাবার সম্ভাবনা থাকবে না।

১৯৯৬ সালের ৫ ডিসেম্বর, মেনড্যাক্স তার অবশিষ্ট ছয়টি অভিযোগের সাপেক্ষে দোষ স্বীকার করে নিলো এবং সবগুলোর জন্যই দন্ড পেলো।

আদালত নিজেও সেদিন যেন মৌন হয়ে গিয়েছিল। বাদীপক্ষের জিওফ শেটল সেদিন ছিলেন না। তাঁর বদলে, শানশিষ্ট, আত্মমগ্ন লেসলি টেলর বিষয়টা দেখেছিলেন। পল গ্যালবালি মেনড্যাক্স’র পক্ষে লড়েছিলেন। কেন ডে ভাবলেশহীনভঙ্গিতে বেঞ্চে বসে ছিলেন। তাঁকে দেখতে কিছুটা ক্লান্ত লাগছিল। কয়েক সারি পেছনে বসা মেনড্যাক্স’র মাকে ভীত দেখাচ্ছিল। ইলেক্ট্রন নিঃশব্দে ঘরের শেষের দিকে ঢুকেছিল এবং মেনড্যাক্স’র দিকে তাকিয়ে এক দুর্বোধ্য হাসি হেসেছিল।

বিচারক রস, রুক্ষ চেহারার এবং চোয়াল-ঝোলা মধ্যবয়স্ক লোক, যাঁর চুলগুলো ছিল ঝোপের মত, আর ছিল ধূসর ভ্রু, তাঁর চেয়ারে বসেছিলেন। প্রথমে, দন্ড ঘোষনার ব্যাপারে তাঁকে বেশ গররাজী দেখাচ্ছিল। তাঁর বোধহয় মনে হচ্ছিল যে কাজটা শুরু থেকেই থাকা বিচারকদের কেউ – বিচারক কিম বা বিচারক লুইস করুন। সেদিন সকালে যখন তিনি আদালতে এসেছিলেন, তখনও তিনি অন্যান্য বিচারকদের বিধৃত শাস্তিগুলো পড়েননি।

লেসলি টেলর অন্য দুই হ্যাকারকে যে শাস্তিগুলো দেওয়া হয়েছিল সেগুলোর সংক্ষিপ্তসার বললেন। বিচারকদের কাউকেই সন্তুষ্ট মনে হল না। অবশেষে, তিনি জানালেন যে মামলাটি তিনিই পরিচালনা করবেন। ‘দুজন বিচারক এটি লুফে নিলেন, তৃতীয়বার কেন নয়? তিনি হয়তো ঠিকমতো কাজটা করতেও পারেন?’

গ্যালবালি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। সকাল যতোই গড়াতে লাড়লো, তিনি ধীরে ধীরে দুর্বল বোধ করতে লাগলেন; কোনোকিছুই ঠিকমতো হচ্ছে না। একটা বিষয়ে সাসপেন্ডেড শাস্তি হয়ে থাকলেও বিচারক রস পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে  হেফাজতমূলক শাস্তিরই পক্ষে। শুধুমাত্র যে ব্যাপারটা মেনড্যাক্সকে বাঁচিয়ে দিবে বলে মনে হচ্ছে সেটা হল দন্ডের সাযুজ্যতা। প্রাইম সাসপেক্ট এবং ট্র্যাক্স, মেনড্যাক্সর মতোই অপরাধ করেছিল এবং সেইজন্যই তাকেও একই ধরণের শাস্তি দিতে হবে।

প্রাইম সাসপেক্ট’র দন্ডের সময় বিচারক লুইস’র দেওয়া বিধানের ব্যাপারে কিছু ‘চমকপ্রদ মন্তব্য’ যুক্ত করলেন। তিনি লেসলি টেলরকে বললেন, সাযুজ্যের প্রেক্ষিতে, অন্যান্য বিচারকদের দেওয়া ‘শাস্তি নিয়ে তিনি এক পর্যায়ে বেশ বিপদে পড়েছিলেন।’ তিনি টেলরকে জিজ্ঞেস করলেন যে তিনি যদি সাযুজ্যের বাইরে চিন্তা করতে চান তাহলে তার কোন কোন যুক্তির উপর জোর দেওয়া উচিত হবে।

তিনি আদালতকে জানালেন যে তিনি টেলিফোনের আড়িপাতাগুলো আইনের আলোকে পড়ে দেখেন নাই। আসলে, তিনি শুধুমাত্র ‘ঘটনার সারমর্মটুকুই পড়েছিলেন’ এবং যখন টেলর ‘ইন্টারন্যাশনাল সাবভার্সিভ’ এর কথা উল্লেখ করলেন, তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেটা কী?’

তারপর তিনি তাঁকে ‘ফ্রিক’ শব্দটার বানান জিজ্ঞেস করলেন।

তারপর ওইদিনই, বিচারক রস অন্যান্য বিচারকদের শাস্তির কথা পড়ে শোনানোর পর, তিনি মেনড্যাক্সকে প্রাইম সাসপেক্ট’র মতোই শাস্তি দিলেন – সবগুলো অভিযোগের ভিত্তিতে একটি লিপিবদ্ধ শাস্তি, এএনইউ কে ২১০০ ডলার ক্ষতিপূরণ এবং তিন-বছরের ভদ্র ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি।

দুটো ব্যতিক্রম ছিল। প্রাইম সাসপেক্ট এবং ট্র্যাক্স দুজনেই ৫০০ ডলারের ভদ্র-ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; বিচারক রস মেনড্যাক্সের কাছ থেকে ৫০০০ ডলারের প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। তাছাড়াও, বিচার লুইস প্রাইম সাসপেক্টকে ২১০০ ডলার ক্ষতিপূরণ দেবার জন্য প্রায় বারো মাস সময় দিয়েছিলেন। বিচারক রস মেনড্যাক্সকে তিনমাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দিয়েছেন।

বিচারক রস মেনড্যাক্সকে বললেন, ‘আমি যা বলেছি তারই আবার পুনরাবৃত্তি করছি। আমি প্রাথমিকভাবে ভেবেছিলাম যে এই অপরাধগুলোর জন্য কারাবাসই যথোপযুক্ত শাস্তি, কিন্তু প্রশমনকারী বিষয়গুলো সেগুলোকে সাসপেন্ডেড শাস্তিতে রূপান্তরিত করেছে। আপনার সহ-অপরাধীদের যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে সেগুলোই মূলত আমাকে আমার অবস্থান থেকে সড়ে আসতে বাধ্য করেছে।’ তিনি জানালেন, ‘তিনি এই বিষয়ে অবগত আছেন যে, অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষদের এইরকম ব্যবহার করা উচিত নয় এবং আপনারা যা করেছেন, আমার বিশ্বাস অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষেরাই সেসব করতে পারেন।’

‘আসক্তি’ শব্দটা শাস্তির অনুলিপিতে কোথাও উল্লেখ ছিল না।