এডমিন আবারো ফিরে এলো। কী জিদ রে বাবা! মেনড্যাক্স আরও একবার এডমিনকে ল্যাঙ মেরে ফেলে দিল, এইবার তার কম্পিউটার স্ক্রিন থামিয়ে দিয়ে।

এই ইঁদুর-বিড়াল খেলা কিছু সময় চললো। মেনড্যাক্স ভেবেছিল এসব বোধহয় এডমিনের নিয়মিত দেখাশোনার কাজ। তাই সে ভাবলো যতোক্ষণ এসব চলে ততক্ষণ তাকে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। যতোবার এডমিন প্রসেস তালিকা বা ডায়াল-আপ লাইন তল্লাসি করে তাকে ধরার চেষ্টা করেছে, ততোবারই সে নিজেকে তারই সিস্টেমের বাইরে আবিষ্কার করেছে।

হঠাৎ, সিস্টেম এডমিনিস্ট্রেটরটি যেন চুপ হয়ে গেলেন। তার টার্মিনাল থেকে গেল।

বেশ, মেনড্যাক্স ভাবলো। তাছাড়াও এখন রাত প্রায় ৩টা বাজে। এখন সিস্টেমে আমার চড়ে বেড়ানোর সময়। আপনার সময় হল দিনের বেলা। আপনি এখন ঘুমান এবং আমি এখন খেলি। সকালে, আমি ঘুমাব এবং তখন আপনি কাজ করতে পারবেন।

তারপর, রাত ৩টার দিকে, একেবারে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলো। সেই এডমিনকে আবার দেখা গেল, এইবার সে তার বাড়ির এক্স.২৫ নেটওয়ার্ক থেকে লগইন করেনি। সে এবার তার কনসোলের সামনে বসে, নরটেল’র মেলবোর্ন অফিসে মাস্টার টার্মিনালে বসে। মেনড্যাক্স বিশ্বাসই করতে পারছিল না। এই মাঝরাতে এডমিন গাড়িতে উঠেছে, তারপর সেটা চালিয়ে সে এই রহস্য সমাধানের জন্য এসেছে।

মেনড্যাক্স জানতো খেলা শেষ। একবার যখন অপারেটর কম্পিউটার সিস্টেমের কনসোল দিয়ে লগইন করেছে, তখন তাকে বের করে দেওয়ার বা থামিয়ে রাখার কোনো উপায় আর নাই। তার ক্ষমতা অসীম এবং এইবার হ্যাকার সেই এডমিনের অনুগ্রহের অধীনস্থ। কনসোলে, সিস্টেম এডমিন চাইলে পুরো সিস্টেম বন্ধ করে দিতে পারেন। প্রতিটা মডেম খুলে ফেলতে পারেন। অন্যান্য যাবতীয় নেটওয়ার্কের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারেন। কম্পিউটার বন্ধ করে দিতে পারেন। খেলা শেষ।

এডমিন যখন একটু একটু করে হ্যাকারের সন্ধানের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন, তখনই একটা বার্তা তার স্ক্রিনে ভেসে উঠলো। এই বার্তার মাথায় সিস্টেম ব্যবহারকারীদের পাঠানো আর দশটা বার্তার মতো প্রেরকের ঠিকানা বা অন্যকিছু ছিল না। এডমিনের স্ক্রিনের ঠিক মাঝখানে জাদুর মতো  ভেসে উঠলো:

অবশেষে আমি বুঝতে পেরেছি।

এডমিন স্তব্ধ হয়ে গেলেন, সাইবারদুনিয়ার গোয়েন্দাদের সহযোগিতা পাবার আশায় হন্যে হয়ে হ্যাকার খোঁজাখুঁজি হঠাৎ বন্ধ করে দিলেন। তারপর আরও একটা বেনামী বার্তা এলো, দেখে মনে হল কম্পিউটার সিস্টেমটার গভীর ভিতর থেকে স্ক্রিনে ভেসে উঠলো:

আমি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছি।

বছরের পর বছর ধরে, আমি এই গোলকধাঁধাঁয় ছিলাম।

কিন্তু এখন আমি আলো খুঁজে পেয়েছি।

এডমিন কোনো উত্তর দিলেন না। কনসোল অলস পড়ে রইলো।

অন্ধকার রাতে, শহরের বাইরে এক কোণায়, এমিগাতে একা একা বসে মেনড্যাক্স উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।  বেশ ভালোই হল।

অবশেষে, এডমিনকে আবারো নড়তেচড়তে দেখা গেল। তিনি মডেমের লাইনগুলোকে একে একে পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করলেন। যদি সে জানতে পারে কোন লাইনটা হ্যাকার ব্যবহার করছে, তাহলে সে সহজেই সেই মডেমটা বন্ধ করে দিতে পারবে। বা সেই সংযোগটায় অনুসন্ধান চালাতে বলতে পারবে।

মেনড্যাক্স এডমিনের কম্পিউটার স্ক্রিনে আরও একটা বার্তা পাঠালো:

আপনার সিস্টেমে চড়ে বেড়াতে দারুণ লেগেছে।

আমরা কোনো ক্ষতি করিনি বরং কিছু জিনিসের উন্নতি করেছি।

দয়া করে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারাল পুলিশকে খবর দিবেন না।

এডিমন বার্তাটাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করলেন এবং হ্যাকারের সন্ধান চালিয়ে গেলেন। সিস্টেম সিরিয়াল পোর্টগুলোতে কোনো টেলিফোন লাইন সক্রিয়া আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে তিনি একটা প্রোগ্রাম চালু করলেন যাতে কোন ডায়াল-আপ লাইন সক্রিয় রয়েছে তা জানা যায়। যখন এডমিন হ্যাকারের ব্যবহৃত সংযোগটির হদীস পেলেন, মেনড্যাক্স সিদ্ধান্ত নিলো এবার কেটে পড়তে হবে। তবে, তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে তার কল অনুসন্ধান করা যেন না যায়, কাজেই সে টেলিফোন রিসিভার তুলে, মডেম সংযোগ খুলে দিল এবং নরটেল মডেমটির পক্ষ থেকে কল কাটার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

নরটেল এডমিন যদি শেষ কল অনুসন্ধান করার জন্য কোনো ব্যবস্থা নিতো তাহলে মেনড্যাক্স জানতে পারতো। যদি এলপিআর অনুসন্ধানব্যবস্থা চালু করা হত, তাহলে নরটেল নিজে থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতো না বরং, সংযোগটা হ্যাকারের তরফ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য অপেক্ষা করতো। সেক্ষেত্রে ৯০ সেকেণ্ড পর, এক্সচেঞ্জ  কলটাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।

হঠাৎ, নিঃস্তব্ধতা।

ঠিক আছে, মেনড্যাক্স ভাবলো। এখন আর মাত্র ৯০ সেকেণ্ড যেতে হবে। এভাবে আর দেড় মিনিট ধরে থাকলেই হবে। আশাকরি এক্সচেঞ্জেরও সময় শেষ হয়ে যাবে। দোয়া করি যেন কোনো অনুসন্ধান না হয়ে থাকে।

ঠিক তখন কেউ একজন নরটেল’র প্রান্ত থেকে ফোনটা ধরলো। মেনড্যাক্স শুরু করল।  পেছনে সে বেশকিছু গলার স্বর শুনতে পেলো, পুরুষ এবং নারী। হায় যীশু। নরটেল’র এরা কী করছে? মেনড্যাক্স এতোই চুপসে গিয়েছিল যে দম নেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল। এ এক কঠিন অপেক্ষার খেলা। মেনড্যাক্স তার বুকের ধুকপুকানি শুনতে পেলো।

তারপর শুনতে পেলো নরটেল’র অফিসে – কোনো এক ভদ্যমহিলা – উচ্চস্বরে বলছে, ‘এখানে তো কিছু নাই। একেবারেই কিছু নাই।’

সে রেখে দিল।

মেনড্যাক্স অপেক্ষা করছিল। অনুসন্ধান চলছে কিনা সেটা না জেনে সে রেখে দিবে না। ফোনের সময় শেষ হবার নব্বই সেকেণ্ড পার হয়ে গেছে। টেলিফোনের সময় শেষ হবার দ্রুত বিপ বিপ শব্দ এর আগে কখনো এতো ভালো লাগেনি।

মেনড্যাক্স শক্ত হয়ে ডেস্কে বসে রইলো, তার মনের ভিতরে আধঘন্টা আগের পুরো ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। নরটেলে আর নয়। খুবই বিপজ্জনক। তার পরম সৌভাগ্য যে সে অজ্ঞাতে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। অনুসন্ধানব্যবস্থা চালু করার আগেই নরটেল তাকে ধরে ফেলতে পারতো, কিন্তু এবার কোম্পানিটি অবশ্যই ডায়াল-আপ লাইনগুলো অনুসন্ধানব্যবস্থা বসাবে। নরটেল টেলিকম’র সাথেও যুক্ত। সবচেয়ে দ্রুত অনুসন্ধান করার ক্ষমতা যদি কারও থেকে থাকে তাহলে সেটা নরটেলেই আছে। মেনড্যাক্সকে এবার প্রাইম সাসপেক্ট এবং ট্র্যাক্সকেও সতর্ক করতে হবে।

সকালে উঠেই মেনড্যাক্স প্রথম যে কাজটি করলো তা হলো, ট্র্যাক্সকে ফোন করে নরটেল থেকে দূরে থাকতে বললো। তারপর সে প্রাইম সাসপেক্টকে বলার চেষ্টা করলো।

টেলিফোন ব্যস্ত ছিল।

সম্ভবত প্রাইম সাসপেক্ট’র মা ব্যবহার করছিলেন, গল্প করছিলেন। হয়তো প্রাইম সাসপেক্টই কোনো বন্ধুর সাথে কথা বলছিল।

মেনড্যাক্স আবার চেষ্টা করল। আবার। আবার। এবার সে চিন্তিত হয়ে পড়লো। প্রাইম সাসপেক্ট যদি এখন নরটেলেই গিয়ে থাকে? যদি অনুসন্ধানব্যবস্থাও চালু হয়ে গিয়ে থাকে? যদি তারা পুলিশকেও খবর দিয়ে থাকে?

মেনড্যাক্স ট্র্যাক্সকে ফোন করলো এবং বললো সে কোনোভাবে এক্সচেঞ্জে কিছু একটা পরিবর্তন করে ওই কলটা কেটে দিতে পারে কিনা। কোনো উপায় ছিল না।

‘ট্র্যাক্স, তুমি সব ফ্রিকারদের ওস্তাদ,’ মেনড্যাক্স মিনতির সুরে বললো। ‘কিছু একটা করো। লাইনটা কেটে দাও। ওকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলো।’

‘হবে না। সে তো একগুচ্ছ টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত আছে। আমাদের কিছুই করার নাই।’

কিছুই করার নাই? অস্ট্রেলিয়ার একটা সেরা হ্যাকার-ফ্রিকার দল সামান্য একটা ফোনকল কেটে দিতে পারে না। তারা পুরো টেলিফোন এক্সচেঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে কিন্তু সামান্য একটা ফোনকর কাটতে পারে না। হায় যীশু।

কয়েক ঘন্টা পরে, মেনড্যাক্স তার সহোদর আইএস হ্যাকারকে ধরতে পারলো। এ যেন হঠাৎ বৃষ্টি।

‘আমাকে একটা কথা বলো। শুধু বলো যে তুমি আজকে নরটেলে ছিলে না?’

প্রাইম সাসপেক্ট একটা দীর্ঘ বিরতি দিয়ে উত্তর দিল।

‘আমি আজকে নরটেলে ছিলাম।’