প্যাড এবং গ্যান্ডাল্ফের সৌভাগ্যই বলতে হবে যে, কির্কহামের সকলেই তাদের ব্যাপারে জানত। তাদের প্রথম সপ্তাহের শেষেরদিন বিকালে ঘরে ফিরে দেখল দরজায় একটা চিহ্ন এঁকে সাঁটানো হয়েছে। তাতে লেখা, ‘নাসা সদর দপ্তর।’

ন্যূনতম নিরাপত্তার অন্যান্য বন্দীরাও হ্যাকিং বিষয়টা বুঝত – এবং এর থেকে অর্থোপার্জনের সম্ভাব্য সকল উপায় সম্পর্কেই তারা অবগত ছিল। কির্কহামের বেশীরভাগ বন্দীই ছোটখাটো চুরি, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি এবং অন্যান্য ছোটখাটো অপরাধের দায়ে দোষী। একজন ফ্রিকারও ছিল, যে প্যাড এবং গ্যান্ডাল্ফ যেদিন এলো সেদিনই এসেছিল। তাকে আট মাসের সাজা দেওয়া হয়েছে – ৮১গ্রাম হ্যাকারদের চেয়ে দুই মাস বেশী – এবং প্যাড ভাবল আন্ডারগ্রাউন্ডের লোকজন তাহলে কি ভাবছে।

তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও, ৮১গ্রামের হ্যাকারদ্বয় কারাগারের ছাঁচের সাথে অভ্যস্থ হতে পারল না। সন্ধ্যাগুলোতে, অন্যান্য বন্দীরা পুল খেলে অথবা নেশা করে অবসর কাটাতো। হলের পাশে শোবার ঘরে, গ্যান্ডাল্ফ তার বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভিএমএসের খুঁটিনাটি নামের একটা বই পড়ত। প্যাড একটা কম্পিউটার বিষয়ক ম্যাগাজিন পড়ত এবং ইন্ডি ঘরানার গান শুনত – বেশীরভাগ সময়ই তার ‘বেবস ইন টয়ল্যান্ড’ টেপটা। জেলখানা বিষয়ক চলচ্চিত্রের অনুকরণে, এই দুই হ্যাকার তাদের ঘরের দেয়ালে টালি কেটে দিনের হিসাব কষত – চারটা দাগ, তারপর আড়াআড়ি দাগ টেনে দেয়া। তারা দেয়ালে বিভিন্ন কথাও লিখত।

দীর্ঘ, আলো ঝলমলে গ্রীষ্মের দিন একের পর এক চলে যেতে লাগল, প্যাড এবং গ্যান্ডাল্ফও জেলখানার ছন্দের সঙ্গে মানিয়ে নিতে লাগল। কোনো বন্দী পালায় নাই তা নিশ্চিত হতে ৮:৩০ মিনিটে সকালের মাথাগোণা দিয়ে শুরু। একরাশ সবুজের মাঝে সারি হয়ে বসে সকালের নাস্তায় শিমের বীজ, বেকন, ডিম, টোস্ট এবং সসেজ খাওয়া। এরপর গ্রীনহাউজগুলোতে, যেখানে এই দুই হ্যাকারের কাজের দায়িত্ব পড়েছে সেখানে যাওয়া।

খুব খাটুনির কাজও নয়। টবের ভিতরে সামান্য খোঁড়াখুঁড়ি। লেটুসের চারাগুলোর চারপাশের আগাছা পরিষ্কার করা, সবুজ মরিচের গাছগুলোতে পানি দেওয়া এবং টমেটোর বীজ বোনা। সকালটা একটু পড়ে গেলে গ্রীনহাউজগুলো যখন বেশ উষ্ণ হয়ে ওঠে, প্যাড এবং গ্যান্ডাল্ফ তখন একটু বাইরের হাওয়া খেতে বেরোয়। বেশীরভাগ সময়ই তারা মেয়েদের ব্যাপারে কথা বলে, চটুল কথাবার্তা বলে, মেয়েদের ব্যাপারে আনাড়ি রসিকতা করে এবং বেশীরভাগ সময়ই তাদের প্রেমিকাদের ব্যাপারে গুরুগম্ভীর আলোচনায় মেতে ওঠে। তাপ একটু সয়ে গেলে, তারা গ্রীনহাউজের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে থাকে।

দুপুরের খাবারে পর, গ্রীনহাউজে আরও কিছু সময় থেকে, প্যাড এবং গ্যান্ডাল্ফ কখনো কখনো জেলখানার চারপাশের মাঠগুলোতে হাঁটতে বের হয়। প্রথমেই ফুটবল মাঠ, তারপর গরুর খোঁয়াড়ে।

প্যাড সঙ্গী হিসেবে পছন্দ হবার মতোই, বিশেষ করে তার সহজ ব্যবহার এবং ঠান্ডা রসবোধের কারণে। তবে, তাকে পছন্দ হবার মানেই তাকে জেনে ফেলা নয়, এবং রসিকতাগুলো মাঝে মাঝেই তার ব্যক্তিতের অনেক গভীরে চিন্তার উদ্রেক করত। কিন্তু গ্যান্ডাল্ফ তাকে জানত, তাকে বুঝত। গ্যান্ডাল্ফ’র সাথে তার সবকিছুই যেত। দীর্ঘ গ্রীষ্মের দিনগুলোতে, তাদের কথাবার্তা যেন ঘাসের উপর মৃদুমন্দ হাওয়ার মতোই বয়ে যেত।

মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানোর সময়, প্যাড মাঝেমাঝেই ডেনিম জ্যাকেট পড়ত। জেল অফিস থেকে দেওয়া বেশীরভাগ কাপড়ই দেখতে ক্যাটক্যাটে নীল, কিন্তু প্যাড সৌভাগ্যবশত এই চমৎকার ডেনিম জ্যাকেটটি পেয়েছে যেটা সে সবসময় পড়ে থাকে।

জেলখানার চারপাশ দিয়ে কয়েকঘন্টা হাঁটার সময়, প্যাড বুঝতে পারত এখান থেকে পালানো কত সহজ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পালাবার তেমন কোনো অর্থ নাই। যেখানেই যাও, পুলিশ তোমাকে ধরে ফেলবে এবং আবার এখানেই নিয়ে আসবে। তখন আবার বাড়তি সময় থাকতে হবে।

সপ্তাহে একদিন করে প্যাড’র মা-বাবা তাকে দেখতে আসত, কিন্তু দেখা করবার সেই মূল্যবান কয়েক ঘন্টা যতোটা না তার কাছে ভাল লাগত তারচেয়ে বেশী ভাল লাগত তার বাবা-মায়ের কাছে। সে তাদের বুঝানোর চেষ্টা করত যে সে ভাল আছে, এবং তার তার চেহারার দিকে তাকিয়ে যখন বুঝত সে সত্য বলছে, তখন দুশ্চিন্তা কিছুটা কমত। তারা তার জন্য বাড়ির খবর নিয়ে আসত, সেইসঙ্গে এও জানাল যে, তার কম্পিউটার সামগ্রীগুলো রেইডের দিনে উপস্থিত থাকা একজন পুলিশ এসে ফেরত দিয়ে গেছে।

অফিসার প্যাড’র মাকে জিজ্ঞেস করেছিল হ্যাকারটি জেলখানায় কেমন আছে। ‘খুব ভাল আছে’, তিনি বলেছিলেন। ‘জেলখানাকে যতোটা খারাপ ভেবেছিল ততোটা খারাপ নয়।’ শুনে অফিসারটির মুখটা যেন হতাশায় চুপসে গেল। সে হয়তো আশা করেছিল যে শুনবে প্যাড চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে।

প্রায় তিনমাস পর, মাথা উঁচু করে, প্যাড এবং গ্যান্ডাল্ফ বেরিয়ে এলো।

[ ]

আদালতকক্ষে বসা সাধারণ দর্শক হিসেবে, ফিনিক্সের মা এবং বাবার দুশ্চিন্তা হওয়াটা স্বাভাবিক। তারা একে অপরের কাছে বসেনি ঠিকই, কিন্তু তাতেও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া নীরব দুশ্চিন্তার ছাপ সংক্রমিত না হয়ে পারে না। ফিনিক্স’র বিচ্ছিন্ন মা-বাবা নোম’র পালক মা-বাবার ঠিক উল্টোপাশে বসেছেন। এরা একটু বয়স্ক, আধাশহুরে বিবাহিত দম্পতি।

২৫ আগস্ট, ১৯৯৩, বুধবারে ফিনিক্স এবং নোম যথাক্রমে পনেরটি এবং দুটি অভিযোগ স্বীকার করে নেয়। রাষ্ট্রপক্ষের যৌথ সাক্ষ্যপ্রমাণের ওজন, ঝুঁকি এবং পূর্ণাঙ্গ মামলা চালাবার ব্যয় এবং জীবন চালাবার ভারে তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। সাক্ষী দেওয়ার জন্য ইলেক্ট্রনকে আসতে হয়নি।

দুদিন ধরে শুনানির সময়, ফিনিক্স’র পক্ষের আইনজীবি, ডাইসন হোর-লেসি, আদালতের অনুগ্রহ পাবার আশায় তার মক্কেলের বাবা-মায়ের গন্ডগোলপূর্ণ বিচ্ছেদ নিয়ে গল্প ফাঁদার পেছনে যথেষ্ট সময় ব্যয় করেছেন। তিনি ফিনিক্সকে বলতে বলেছেন যে, সে তাদের এই তিক্ত বিচ্ছেদের সময়ই কম্পিউারের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং এই বিচ্ছেদই তাকে জেলখানা এড়াতে সবচেয়ে সহায়ক ভূমিকা নিবে। সবচেয়ে বড় কথা, আসামীপক্ষ ফিনিক্সকে এমন একজন যুবক হিসেবে উপস্থাপন করতে চায় যে সঠিক পথ থেকে বিচ্যূত হয়েছে কিন্তু এখন আবার একটা চাকরি নিয়ে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করে সঠিক পথে ফিরে এসেছে।

ডিপিপি ফিনিক্সের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিল। তাদের দেখে মনে হল তারা তার দীর্ঘ কারাবাস নিশ্চিত করার পক্ষে বদ্ধ পরিকর এবং তারা ফিনিক্সকে একজন উদ্ধত দাম্ভিক হিসেবে প্রমাণের জন্য নাছোড়বান্দা। আদালত ফিনিক্সের একটা টেপ-রেকর্ডিং শুনল যেখানে সে কার্নেগী মেলন ইউনিভার্সিটি’র কম্পিউটার এমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের নিরাপত্তা-গুরু এডওয়ার্ড ডিহার্টকে ফোন করে একটা নিরাপত্তা গোলযোগ ঘটাবার ব্যাপারে শাসাচ্ছিল। ফিনিক্স ডিহার্টকে কম্পিউটার চালু করে তাকে ‘পাসওয়ার্ড -এফ’ সিকিউরিটি বাগ অনুযায়ী সবগুলো ধাপ অতিক্রম করিয়ে দিতে বলেছিল। মজার কথা হল, ইলেক্ট্রনই প্রথম ওই নিরাপত্তা গোলযোগ আবিষ্কার করে এবং ফিনিক্স শেখায় – যেটা ফিনিক্স স্বাভাবিকভাবেই ডিহার্টকে বলতে চায়নি।

এএফপি’র সাউদার্ন রিজিওন কম্পিউটার ক্রাইমস ইউনিটের প্রধান, ডিটেকটিভ সার্জেন্ট কেন ডে সেদিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এইবার সে কোনোমতেই সুযোগ হাতছাড়া করবে না। যে দর্শক এতোক্ষণ ফিনিক্স’র মা-বাবার উদ্বেগ বুঝতে পারছিল তারা হয়তো ডে এবং ফিনিক্সের ভিতরকার অন্তঃকলহটাও টের পেয়ে থাকবে। এই অন্তঃকলহ এমনিতে ডে অথবা রেল্ম হ্যাকারদের দেখে বোঝার উপায় নাই।

ডে, একজন বেঁটে, সদাসতর্ক মানুষ যিনি এই ঘটনায় হাওয়া দিয়েছেন, দেখে মনে হয় যেন ফিনিক্সের প্রতি তীব্র ঘৃণা রয়েছে। একই ধরণের বিতৃষ্ণা দুজনেরই ছিল। একজন ঠান্ডা মাথার পেশাদার, ডে জনসম্মখে ঘৃণা প্রকাশ করে এমন কোনো মন্তব্যই করবেন না – সেটাই তার স্বভাব। তার ঘৃণা শুধুমাত্র ওই শক্ত করে রাখা দুর্বোধ্য মুখেই যতোটুকু প্রকাশ পাচ্ছে।

৬ অক্টোবর, ১৯৯৩, ফিনিক্স এবং নোম ডকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শাস্তির জন্য অপেক্ষা করছিল। একটা কঠোর অভিব্যক্তি ধারণ করে, বিচারক স্মিথ দুজন হ্যাকারেরই অভিযোগগুলোর বিস্তারিত এবং দ্য রেল্ম’র উত্থানের ইতিহাস বর্ণনা করলেন। কিন্তু, সেই সংক্ষিপ্তসারের মধ্যেই, বিচারক ফিনিক্সকে কঠোর করে ধমকে দিলেন।

‘আপনার আচরণের মধ্যে….প্রশংসা করার মতো কিছুই নাই এবং প্রতিটা কাজেরই নিন্দা করার ষোলআনা যুক্তি আছে। আপনি কয়েকজন সিস্টেম এডমিনিস্ট্রেরের [দুর্বলতা] তুলে ধরেছেন…[কিন্তু] সেসব আপনার কোনো অটিজমের প্রকাশ নয়। সেগুলো পুরোপুরিই আপনার দম্ভ এবং উন্নাসিকতার প্রকাশ বৈ আর কিছু নয়।’

‘আপনি…আপনার কৃতকর্ম নিয়ে দম্ভ দেখিয়েছেন এবং তা বজায় রেখেছেন…আপনার কর্মকান্ড…আপনার দম্ভ, প্রকাশ্য অবাধ্যতা, এবং সিস্টেমকে পরাস্ত করবার মানসিকতারই প্রকাশক। [আপনি] অল্প সময়ের মধ্যেই অসংখ্য সিস্টেমে লক্ষ্য করে ক্ষতি সাধন করেছেন।’

যদিও শাস্তি দেওয়ার সময় বিচারককে দেখতে বেশ নরম মনে হল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার সিদ্ধান্ত নিয়ে সে নিজেও বেশ আতঙ্কিত ছিল। তিনি একটা পার্থক্য সৃষ্টির লক্ষ্যে যা দেখেছে্ন তা দিয়েই একটা সমন্বয় করতে চেয়েছেন, অস্ট্রেলিয়াতে হ্যাকিং মামলার শাস্তি, এবং এই মামলার ব্যক্তিদের অবস্থা বিবেচনায় তিনি একটা নজির তৈরি করতে চেয়েছেন। অবশেষে, বারবার যুক্তিতর্কগুলো পড়ে পড়ে, তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।

‘আমার কোনো সন্দেহ নাই যে, আমাদের সমাজের কোনো কোনো অংশ হেফাজতমূলক কারাবাসের শাস্তি না হলে সেটাকে যথাযথ মনে করবেন না। আমিও তাই মনে করি। কিন্তু, অনেক বিষয় বিবেচনার পর.. আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে এই মুহূর্তে কারাদন্ড দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নাই।’

বিচারক ফিনিক্সকে দুই বছরের জন্য ৫০০ ঘন্টার সমাজসেবামূলক কাজ এবং ১০০০ ডলারের বারো মাস মেয়াদী ভাল ব্যবহারের মুচলেকা দিতে আদেশ দিলে হ্যাকারদের বন্থুবান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজনরা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তিনি নোমকে ২০০ ঘন্টার সমাজসেবামূলক কাজ, ৫০০ ডলারের, ছয়-মাস মেয়াদী ভালো ব্যবহারের মুচলেকা দেবার আদেশ দিলেন।

ফিনিক্স যখন আদালতকক্ষ ত্যাগ করছিল, তখন একজন লম্বা, শুকটো যুবক চেয়ার ঠেলে এগিয়ে এলো।

‘অভিনন্দন,’ সেই অচেনা ছেলেটি বলল, তার কাঁধে ঝুলে থাকা জটিল কোঁকড়া চুল নাড়িয়ে।

‘ধন্যবাদ,’ ফিনিক্স উত্তর দিল, মাথা খুঁটে এই বাচ্চা মুখটাকে চেনার চেষ্টা করল যে কিনা তার চেয়ে বসয়ে বড় হবে না। ‘আমি কি তোমাকে চিনি?’

‘হুম, একরকম,’ সেই অচেনা ছেলেটি উত্তর দিল। ‘আমি মেনড্যাক্স। আমিও তোমার মত পরিস্থিতিতে পড়তে যাচ্ছি, তবে তোমার চেয়েও বাজেভাবে।’