ইলেক্ট্রন আর ফিনিক্সের সঙ্গে কথা বলত না, কিন্তু ডিপিপি আইনজীবিরা তাকে ভুলে যায়নি — এরই মাঝে। ফিনিক্সের জন্য তাদের আরও বড়সড় পরিকল্পনা ছিল, কারণ হয়তো সে প্রতিটা ধাপেই তখনো লড়ে যাচ্ছিল। তল্লাসির দিনেও ফিনিক্স পুলিশের সাথে অসহযোগিতামূলক আচরণ করেছিল, বারবার প্রশ্নের উত্তর দিতে অসম্মতি জানিয়েছিল। যখন তারা তার আঙ্গুলের ছাপ নিতে চেয়েছিল, সে তাতেও অসম্মতি জানিয়েছিল এবং তাদের সঙ্গে তর্কও করেছিল। এহেন ব্যবহারে তখন পুলিশ বা ডিপিপি’র কেউই খুশী হয়নি।

১৯৯২ সালের ৪ মে, ডিপিডি ফিনিক্স’র বিরুদ্ধে ৪০ টি অভিযোগ সম্বলিত একটি আর্জি কাউন্টি কোর্টে পেশ করে। ওই অভিযোগগুলোর সঙ্গে নোম এবং ইলেক্ট্রনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোকে যুক্ত করে, ৫৮টি অভিযোগ সম্বলিত একটি সমন্বিত আর্জি তৈরি হল।

ইলেক্ট্রন জেল খাটার ব্যাপারে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। সারা দুনিয়া ধরেই হ্যাকারদের ধরপাকড় চলছে — পার, পেঙ্গু, এলওডি এবং এরিক ব্লাডএক্স, মড, দ্য রেল্ম’র হ্যাকাররা, প্যাড এবং গ্যান্ডাল্ফ এবং, সবর্শেষ, দ্য ইন্টারন্যাশনাল সাবভার্সিভস। কোথাও কেউ কলকাঠি নাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। উপরন্তু, ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাসের কাগজপাতিগুলোর তুলনায় এবার ইলেক্ট্রন’র বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন করা হয়েছে — যাতে আরও খারাপ অবস্থা করা যায়।

ডিপিপি’র চূড়ান্ত আর্জির সঙ্গে সেই তল্লাসির দিনে পুলিশ স্টেশন ছাড়ার সময় যুবক হ্যাকারকে দেওয়া আসল অভিযোগনামার কোনো মিল নেই বললেই চলে। চূড়ান্ত অর্জিটা পড়তে দুনিয়াব্যাপী কার কোন মহান প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ক্ষতি হয়েছে সেই তালিকার মত লাগল। লরেন্স লিভারমোর ল্যাবস, ক্যালিফোর্নিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি নাভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির দুটি কম্পিউটার, ওয়াশিংটন ডিসি। রুটজার্স ইউনিভার্সিটি, নিউ জার্সি। ট্যাম্পেয়ার ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, ফিনল্যান্ড। দ্য ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনিওস। মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির তিনটি ভিন্ন ভিন্ন কম্পিউটার। হেলসিঙ্কি ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, ফিনল্যান্ড। দ্য ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক। নাসা ল্যাঙলি রিসার্চ সেন্টার, হ্যাম্পটন, ভার্জিনিয়া। সিএসআইআরও, কার্লটন, ভিক্টোরিয়া।

যে অভিযোগগুলো নিয়ে ইলেক্ট্রন সবচেয়ে ঘাবড়ে গিয়েছিল সেগুলোর বেশীলভাগই ছিল ইউএস নাভাল রিসার্চ ল্যাবস, সিএসআইআরও, লরেন্স লিভারমোর ল্যাবস এবং নাসা সংক্রান্ত। শেষের তিনটিকে পুরোপুরি হ্যাকিঙের অভিযোগ বলা যায় না। ডিপিপি দাবী করেছে যে ইলেক্ট্রন এইসব সাইটে ফিনিক্স’র আনাগোনার কথা ‘ভালোভাবেই জানত।’

ইলেক্ট্রন তের-পৃষ্ঠার সমন্বিত আর্জিখানায় চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারল না তার হাসা উচিত নাকি কাঁদা। ওইসব সাইটে ঢোকার ব্যাপারে ‘ভালোভাবেই জানার’ বাইরেও অনেককিছুই সে জানে। অনেক সময়, সে নিজেই প্রথমে ফিনিক্সকে ওইসব কম্পিউটারে ঢোকার পথ বাতলে দিয়েছে। কিন্তু বেশীরভাগ সিস্টেমের ক্ষেত্রেই ইলেক্ট্রন সতর্ক পদক্ষেপ নিত, খুব বুঝেশুনে, আর, ফিনিক্স মোষের মত চিৎকার করতে করতে ওইসব করে বেড়াত — এবং অনেক আলামত ফেলে আসত। ইলেক্ট্রনের সেইসব বা অন্যকোনো সাইটের কারণে অভিযোগ বয়ে বেড়ানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নাই। ইতোপূর্বে সে হাজার হাজার এক্স.২৫ নেটওয়ার্কে ঢুকেছে, কিন্তু সেসবের কোনোটার জন্যই তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার জন্য আল কাপোনে যা করেছিল, তার নিজের বেলাতেও অনেকটা সেইরকম ভাবতে ইচ্ছে হল।

মামলাটা গণমাধ্যমের যথেষ্ট মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল। ইলেক্ট্রনের সন্দেহ এএফপি বা ডিপিপি-ই গণমাধ্যমগুলোকে মামলায় হাজিরার দিনগুলোর কথা জানিয়ে দিচ্ছিল, সম্ভবত আমেরিকানদের কাছে এই বার্তা পোঁছাতে যে ‘কিছু একটা করা হচ্ছে’।

এই মামলাটায় যে মার্কিনীদের চাপ আছে সেকথা খুল্লম খুল্লাই বলা হচ্ছে। ইলেক্ট্রন’র ব্যারিস্টার, বোরিস কায়সার, বলছিলেন তার সন্দেহ হয় ‘মার্কিনীদের’ — বিভিন্ন মার্কিস প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা সরকারি এজেন্সি — পরোক্ষভাবে কয়েকটা মামলার বাদী পক্ষদের জন্য মার্কিন সাক্ষীদের আদালতে পাঠাবার খরচ দিয়ে সাহায্য করছে। মার্কিনীরা অস্ট্রেলিয়ান হ্যাকারদের পতন দেখতে চায়, এবং তাই তারা মামলার মধ্যে তাদের সেরা মালমশলা পাঠানোর বন্দোবস্ত করেছিল যেন চূড়ান্ত পতন ঘটে।

তবে একটা জিনিস — বলতে গেলে সবথেকে বিরক্তিকর একটা ঘটনাও আছে। এই আইনের দৌড়াদৌড়ির মধ্যেই, ইলেক্ট্রনকে জানতে পারল মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসই ১৯৮৮ সালে দ্য রেল্ম’র হ্যাকারদের নিয়ে এএফপি’র তদন্তের সূচনা করে — এই তদন্তেই ইলেক্ট্রন ধরা খেয়েছে এবং এখনকার আইনি ঝামেলাগুলো পোহাচ্ছে। সিক্রেট সার্ভিস সিটিব্যাংকে অনুপ্রবেশকারী হ্যাকারদের পিছনে লেগেছিল।

এমনটা হবে ভেবেই, ইলেক্ট্রন কখনো সিটিব্যাংকে মাড়ায়নি। ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারে তার আগ্রহ বরাবরই কম ছিল। ব্যাংকের বিষয়াশয় তার কাছে খুব একঘেয়ে লাগত এবং তার কাছে মনে হত, তাদের কম্পিউটারগুলো একাউন্টিং জগতের নিতান্তই নিরস কিছু সংখ্যা দিয়ে ঠাসা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সের কারণে ইতিমধ্যেই সে এইরকম একরাশ সংখ্যার যাতাকলে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে। আর তার যেহেতু ব্যাংক ডাকাতির কোনো ইচ্ছাও নাই — এমন কাজ করার কথা সে কখনো চিন্তাও করে না — কাজেই ওইসব কম্পিউটারে ঢোকারও কোনো যুক্তি নাই।

কিন্তু মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের আবার ব্যাংকের ব্যাপারে দারুণ আগ্রহ — এবং, ফিনিক্সের ব্যাপারেও। ফিনিক্স যে শুধু সিটিব্যাংকের কম্পিউটারেই ঢুকেছিল সেটুকুই তাদের বিশ্বাস নয়। তারা এও বিশ্বাস করেছিল যে, সিটিব্যাংকে হামলার সে-ই ছিল নাটের গুরু।

কিন্তু সিক্রেট সার্ভিস এমনটা মনে করেছিল কেন? কারণ, ইলেক্ট্রন বলেছিল যে, ফিনিক্স এই নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে অনেক বেশী লাফালাফি করেছে। সে যে সিটিব্যাংকের কম্পিউটারে ঢুকেছে শুধু সেইকথাই লোকেদের বলেনি, সে বারবার উচ্চস্বরে বলেছে যে, সে প্রায় ৫০০০০ ডলার সেই ব্যাংক থেকে চুরিও করেছে।

আইনি নির্দেশনাগুলো দেখার সময়, ইলেক্ট্রন এরকমই একটা ঘটনা খুঁজে পেয়েছিল যা দেখে সে তার ওইসব শোনা কথার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছিল। ফিনিক্সের বাড়ির দুটো ফোনে আড়িপাতার পরোয়ানায় কারণ হিসেবে ‘সিটিব্যাংকের বিরাট ক্ষতিসাধন’ কথাটি বলা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে, সেই টাইপকরা কথাগুলো যে বিচারক পরোয়ানাটা গ্রহণ করেছিলেন তিনি নিজহাতে হিজিবিজি করে কেটে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা তখনও পড়া যাচ্ছিল। মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস যে এই মামলার নেপথ্যে ইন্ধন দিচ্ছে তাতে আর আশ্চর্যের কিছু নাই, ইলেক্ট্রন ভাবল। মানুষ ব্যাংকগুলোকে গোপনে উপড়ে ফেলার রাস্তা পেয়ে গেলে ব্যাংকের বিচলিত হবারই কথা।

ইলেক্ট্রন জানত যে ফিনিক্স সিটিব্যাংক থেকে কোনো টাকা চুরি করেনি। অথচ, সে নিজের সম্পর্কে এইরকম মনগড়া গপ্পো ফেঁদে আন্ডারগ্রাউন্ডে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করছিল, এবং এই করতে গিয়েই সে সবাইকে ধরিয়ে দিতে অবদান রেখেছে।

১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে. ফিনিক্স, একসঙ্গে মামলাটা আলোচনা করার পরামর্শ জানাতে ইলেক্ট্রনকে ফোন করল। ইলেক্ট্রন অবাক হয়ে গেল কেন। হয়তো, তা কোনো সন্দেহ তৈরি হয়েছিল, হয়তো সে বুঝতে পারছিল যে তাদের মধ্যকার যোগসূত্রটা দুর্বল হয়ে গিয়েছে এবং যত মাস গড়াবে ততোই দুর্বল হতে থাকবে। মানসিক অসুস্থতা ইলেক্ট্রনের জীবনদর্শনকে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। ফিনিক্সের সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান দূরত্বের পেছনে লুকিয়ে ছিল তার লাফালাফি নিয়ে পুষে রাখা রাগ। কারণ যাইহোক, ইলেক্ট্রনের এই শীতল ব্যবহারের ফলে ফিনিক্স’র বেদনা আরও তীব্র হয়েছিল।

ইলেক্ট্রন ফিনিক্সের সঙ্গে দেখা করতে চাইত না কারণ সে তাকে পছন্দ করত না, এবং সে আরও মনে করত, অস্ট্রেলিয়ান হ্যাকারদের আজকেরই এই ভোগান্তির জন্য ফিনিক্সই মূলত দায়ী।

এইসব চিন্তা তার মনের ভিতরে যখন জমছিল, তার কয়েক মাসের মাঝেই তার উকিল, জন ম্যাকলাফলিনের দেওয়া একটা বুদ্ধিতে ইলেক্ট্রন সায় দিল। আইনের দুনিয়ায়, জিনিসটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ইলেক্ট্রনের কাছে বিষয়টা ছিল একদম নতুন। সে ঠিক করল ম্যাকলাফলিন’র উপদেশটা গ্রহণ করবে।

ইলেক্ট্রন ঠিক করল ফিনিক্সের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হবে।