কখনো কখনো এরিকের চিন্তা হত যে ফিনিক্স এতো এতো আন্তর্জাতিক কল করে আবার জ্যাম বাঁধিয়ে না ফেলে। সে যে অস্ট্রেলিয়ানদের সঙ্গে কথা বলতে অপছন্দ করত তা নয়; তার দারুণ লাগত। তবুও, সেই ব্যাপারে দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা, তার মনে সবসময়ই খুঁতখুঁত করত। ফিনিক্সকে সে কয়েকবার ব্যাপারটা জিজ্ঞেসও করেছিল।

‘কোনো সমস্যা নাই। শোনো, এটিএন্ডটি তো কোনো অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি নয়,’ ফিনিক্স বলত। ‘ওরা আমার কিছু করতে পারবে না।’ এবং এরিক এ অবস্থাতেই ব্যাপারটা রেখে দিয়েছিল।

এইজন্য, এরিক কখনো ফিনিক্সকে কল করত না, বিশেষ করে ইউএস সিক্রেট সার্ভিস’র তল্লাসির পর থেকে তো আরও নয়। ১৯৯০ সালের ১ মার্চ, তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে, ভোরবেলা তার বাড়িতে ঢুকে পড়ে। গোয়েন্দারা সবখানে তল্লাসি চালায়, সেই ছাতাবাসটিকে তছনছ করে ফেলে, কিন্তু তারা অবৈধ কোনোকিছু সেদিন পায়নি। তারা এরিক’র ৫৯ ডলার দামের কিবোর্ড টার্মিনাল আর সাথেকার সস্তা ৩০০ বড মডেমটা নিয়ে যায়, কিন্তু তার আসল কম্পিউটারটি খুঁজে পায়নি, কারণ, এরিক জানত তারা আসছে।

সিক্রেট সার্ভিস তার একাডেমিক রেকর্ড জব্দ করে, এবং এরিক তল্লাসির আগেই সেটা সম্পর্কে জানতে পারে। কাজেই, যখন সিক্রেট সার্ভিস আসে, এরিক’র জিনিসপত্র ততক্ষণে হাওয়া। জিনিসগুলো প্রায় কয়েক সপ্তাহ তার কাছে ছিল না, কিন্তু এরিক’র কাছে, সেই সময়টুকু ছিল সবথেকে কঠিন সময়। সেই হ্যাকারটি বুঝতে পারল সে নেশাখোরের মত অস্থির হয়ে উঠছে, কাজেই সে সবথেকে সস্তা একটা নিত্য ব্যবহার্য কম্পিউটার এবং মডেম কিনে নিয়ে এসে নিজেকে প্রবোধ দিল।

ওই কম্পিউটারের জিনিসপত্রগুলোই শুধুমাত্র সিক্রেট সার্ভিসের লোকজন খুঁজে পেয়েছিল এবং তারা তাতে খুব খুশী হয়নি। কিন্তু, কোনো রকম প্রমাণ ছাড়া, তাদেরও হাত-পা বাঁধা। কাজেই, কোনো অভিযোগ তারা দিতে পারল না।

তবুও, এরিকের মনে হত সে নজরদারির মধ্যে আছে। সর্বশেস যে ব্যাপারটি সে চেয়েছিল তা হল ফিনিক্স’র নাম্বার যেন তার বাড়ির ফোন বিলে আসে। কাজেই সে ফিনিক্সকে কল করতে দিয়েছিল, যা অস্ট্রেলিয়ানটি সবসময়ই করত। রাত জেগে কাজ করার সময় এরিক ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলত। কাজটা বেশ ঢিলেঢালা, বিভিন্ন কম্পিউটারের ব্যাকআপ টেপগুলোকে পরিবর্তন করা আর সেগুলো যেন জ্যাম না হয়ে যায় তা খেয়াল রাখা। যেকোন শিক্ষার্থীর জন্যই অসাধারণ একটা কাজ। এতে এরিকের প্রচুর সময় বেঁচে যেত।

এরিক প্রায়ই ফিনিক্সকে মনে করিয়ে দিত যে তার ফোনে সম্ভবত আড়িপাতা হচ্ছে, কিন্তু ফিনিক্স হেসেই উড়িয়ে দিত। ‘হ, তুমি এইটা নিয়া চিন্তা কিরো না, বন্দু। ওরা কি আর করবে? এসে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে?’

এরিক হ্যাকিং সংক্রান্ত কাজকর্ম বন্ধ রাখার পর, ফিনিক্স’র কথামতো গা বাঁচিয়ে চলত। সেই অস্ট্রেলিয়ানটি কোনো কারিগরি সমস্যা বা কোনো কৌতুহলোদ্দীক সিস্টেম নিয়ে কল দিলে তারা মেশিনে অনুপ্রবেশের বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলাপ করত। তবে, ইলেক্ট্রনের সাথে ফিনিক্স যা বলত, এরিক’র সঙ্গে শুধু সেরকম হ্যাকিং নিয়েই কথা হত না। তারা জীবন নিয়ে আলাপ করত, অস্ট্রেলিয়া নিয়ে আলাপ করত, মেয়েদের নিয়ে, সংবাদপত্র নিয়ে আলাপ করত। এরিকের সাথে কথা বলা খুবই সহজ ছিল। বেশীরভাগ হ্যাকারের মত তারও বিরাট অহমবোধ ছিল, কিন্তু তা রূঢ় নয়, বেশীরভাগটাই তার নিজের ব্যাপারে রসিকতার আড়ালে থাকত।

ফিনিক্স প্রায় এরিককে হাসাত। যেমন যেসময় সে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লিফোর্ড স্টোলের দেখা  পেল, যিনি দ্য কাক্কু’স এগ লিখেছিলেন। সেই বইটিতে তিনি একজন জার্মান হ্যাকারের পেছনে লাগার কথা বর্ণনা করেছিলে, যে স্যান ফ্রান্সিসকোতে লরেন্স বার্কলে ল্যাবসে স্ট্রলের তত্ত্বাবানে থাকা কম্পিউটারের অনুপ্রবেশ করেছিল। সেই হ্যকারটি পেঙ্গু’র মতোই কোনো একটা হ্যাকার চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। স্টোল হ্যাকিঙের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ছিলেন, সেই অবস্থান আন্ডারগ্রাউন্ডে তাকে কোনো জনপ্রিয়তা এনে দেয়নি। ফিনিক্স এবং এরিক দুজনেই স্টোল’র সেই বই পড়েছে এবং একদিন বসে থাকতে খাকতে তারা সেটা নিয়েই আলাপ করছিল।

‘বুচ্ছো, ক্লিফি যে তার ইমেইল ঠিকানা তার বইতে দিয়েছে এইটা একটা বোকামি করেছে,’ ফিনিক্স বলল। ‘হুমম, আমি গিয়ে জিনিসটা নেড়েচেড়ে দেখে আসি?’

একদিন পর ফিনিক্স এরিককে জানাল, একেবারে নিশ্চিত। ‘আমি ক্লিফির মেশিনের রুট পেয়ে গেছি,’ সে নির্বিকারে বলল, এরপরই হাসিতে ফেটে পড়ল। ‘আর আমি প্রতিদিনের বার্তাও পরিবর্তন করে দিয়েছি। এখন ওখানে ঝুলছে, “মনে হচ্ছে কোকিলটা তোমার মুখে আন্ডা মেরে গেছে”!’

এতো হাস্যকর একটা ঘটনা। দুনিয়ার সবথেকে বিখ্যাত হ্যাকার-শায়েস্তাকারী স্টল’র সাথেই কিনা এমন ঠাট্টা! এরিক’র কাছে চলতি সপ্তাহের সবথেকে হাস্যকর ঘটনা হয়ে গেল সেটি।

কিন্তু এরপর নিউ ইয়র্ক টাইমসে যা আসল সেটা এরিককে বলা ফিনিক্সের কথার চেয়েও হাস্যকর। ১৯ মার্চে সংবাদপত্রটিতে ছাপানো একটা নিবন্ধে বলা হল অজ্ঞাত কোনো হ্যাকার একটি ভাইরাস বা ওয়ার্ম জাতীয় কিছু একটা লিখেছে এবং  ডজনখানেক কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়েছে।

‘এইটা শোনো’ এরিক বলল, ফিনিক্সকে চুম্বক অংশটুকু পড়ে শোনাতে শোনাতে, ‘“জনৈক অনুপ্রবেশকারী একটি প্রোগ্রাম লিখেছেন যেটি দেশজুড়ে গত কয়েক সপ্তাহে ডজনখানেকেরও বেশী কম্পিউটারে ঢুকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারকারীদের পাসওয়ার্ডের মত বৈদ্যুতিক তথ্য চুরি করেছে এবং নিজেকে আড়াল করার জন্য বিভিন্ন ফাইল মুছেও দিয়েছে।”

ফিনিক্স এতো জোরে হেসে উঠেছিল যে চেয়ার থেকে পড়ে গেল। একটা প্রোগ্রাম? সেইটা নাকি আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব করছে? না। কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ান! রেল্ম হ্যাকাররা! হায় খোদা, এতো হাস্যকর।

‘থামো– আরও আছে! কি বলছে দেখ, “আরও একটা নচ্ছার প্রোগ্রাম বহুল প্রচারিত দুর্বলতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে”। আমিতো হেসেই কুল পাচ্ছি না,’ এরিক বলল, কোনোমতে।

‘একটা নচ্ছার প্রোগ্রাম! এই নিবন্ধটা কে লিখেছে?’

‘কোনো এক জন মার্কফ,’ এরিক বলল, চোখ মুছে। ‘আমি ওকে কল করেছিলাম।’

‘তাই নাকি? কি বললে?’ ফিনিক্স নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করল।

আমি বললম, ‘“জন, তুমি কি জানো টাইমসে’র ১২ পাতায় যে নিবন্ধটা লিখেছ সেটা পুরোপুরি ভুল?! কোনো নচ্ছার প্রোগ্রাম ইন্টারনেটে আক্রমণ করেনি।” সে বলল,”তাহলে কি হয়েছে?” আমি বললাম,”ওইটা কোনো ভাইরাস বা ওয়ার্ম না, আস্ত মানুষ।”

এরিক আবারো বিকট স্বরে হাসতে লাগল।

‘তারপর মার্কফ খুব আশ্চর্য হয়ে গেল এবং বলল, “মানুষ?” এবং আমি বললাম, “হ্যাঁ, মানুষ।” তারপর সে বলল, “তুমি কিভাবে জানো?” এবং আমি বললাম, “কারণ, জন, আমি জানি।”

ফিনিক্স আবার হাসিতে ফেটে পড়ল। টাইমেসর প্রতিবেদক ভদ্রলোকের মনে প্রথম দফাতেই ওয়ার্মের কথাই মাথায় এসেছিল, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে বিখ্যাত ইন্টারনেট ওয়ার্মের স্রষ্টা রবার্ট টি. মরিস জুনিয়র’র বিচার এবং দোষ প্রমাণিত  হয়ে গেছে। মে মাসে তার সাজা শোনানোর দিন ধার্য হয়েছে।

মার্কিন গোয়েন্দারা হ্যাকারের সংযোগুলোকে অনুসরণ করেছে, সুড়ঙ্গ অভিযানের মত একের পর এক সাইটের সূত্র ধরে এগোনোর পর তাদের পানে হয়েছে যে কোনো ওয়ার্মের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। এতো অল্প সময়ে এতোগুলো সাইটে অনুপ্রবেশের চেষ্টা গোয়েন্দাদের হতবুদ্ধি করে দিয়েছিল, যারা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেয় যে কোনো মানুষ নয় বরং প্রোগ্রামই এইসব আক্রমণ চালাচ্ছে।

‘হ,’ এরিক বলে চলল, ‘আর তারপর মার্কফ বলল, “তুমি তাদের সঙ্গে আমাকে কথা বলিয়ে দিতে পারবে?” আর আমি বললাম পারলে আমি জানাব।’

‘হ,’ ফিনিক্স। ‘ওকে গিয়া বলো, ঠিক আছে। আমি ওই বোকাচোদার সাথে কথা বলব। আমি ওকে সব বুঝায় দিব।’

নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২১ মার্চ ১৯৯০, প্রথম পাতা: ‘জনৈক কলদাতা বলেছেন বিশেষজ্ঞদের টেক্কা দিতেই তিনি কম্পিউটারের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে থাকেন’, জন মার্কফ লিখেছে।

সত্যি, পাঠকের চোখ সবার প্রথমে যেখানে গিয়ে পড়ে- পত্রিকার ভাঁজের একদম নিচে – দ্বিতীয়ার্ধে- নিদেনপক্ষে কলাম ১ জুড়ে নিবন্ধটা ছাপা হয়েছিল।

ফিনিক্স তো খুশীতে ডগমগ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পাতায় তার কথা চলে এসেছে।

‘লোকটি শুধুমাত্র নিজেকে ডেভ নামের একজন অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে পরিচয় দেন,’ নিবন্ধের ভাষ্য। ফিনিক্স মুখ টিপে হাসল। ডেভ লিসেক হল তার ছদ্মনাম। অবশ্য, সে একাই ডেভ নামটা ব্যবহার করে এমন নয়। আলটসে এরিক যেদিন প্রথম অস্ট্রেলিয়ানদের সাথে পরিচিত হয়েছিল, সে গণহারে সবার নাম ডেভ দেকে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। আমি ডেভ, ও ডেভ, আমরা সবাই ডেভ, তারা বলল। তাদের ভাষ্যে, এভাবে বুঝাই বরং সবথেকে সহজ।

নিবন্ধে বলা হয়েছিল যে ‘ডেভ’ স্প্যাফ এবং স্টোল’র মেশিনে আক্রমণ করেছে, এবং স্টোল এখন যেখানে কাজ করে – হারভার্ড ইউনিভার্সিটি’র স্মিথসনিয়ান এস্ট্রোনমিক্যাল অবজার্ভেটরি – এই আক্রমণের ঘটনায় তাদের কম্পিউটারগুলো থেকে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। মার্কফ এমনকি ফিনিক্স’র বলা ‘মুখে আন্ডা মারার’ ঘটনাটাও যুক্ত করে দিয়েছিল।

ফিনিক্স  ক্লিফি স্টোলকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে পারার আনন্দে হেসে উঠল। এই নিবন্ধটা তাকে বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরেছে। এভাবে নিজেকে ছাপার হরফে দেখতে খুবই ভাল লাগছে। সে এটা করতে পেরেছে। কালিতে লেখা ওই কথাগুলো তারই, যা পুরো বিশ্ব দেখতে পাচ্ছে। সে দুনিয়ার সবথেকে সেরা হ্যাকার-শিকারিকে ঘোল খাইয়েছে, এবং আমেরিকার সবথেকে মর্যাদাপূর্ণ পত্রিকার প্রথম পাতায় সেই অপমানের খবর ফলাও করে প্রচারও করাতে পেরেছে।

মার্কফ এও বলেছে যে সে স্ফ্যাফ’র সিস্টেমেও ঢুকেছিল! ফিনিক্স আনন্দে ঝলমল করছিল। আরও ভাল কথা হল, মার্কফ সেটা নিয়ে ‘ডেভ’র’ বক্তব্যও প্রকাশ করেছে: ‘কলার বলেছেন…..”সাধারণত গোয়েন্দাদের দেখা যায় হ্যাকারদের পিছনে লেগে আছে। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে হ্যাকাররাই গোয়েন্দাদের পিছনে লেগেছে।”’

নিবন্ধে আরও আছে: আরও যেসমস্ত প্রতিষ্ঠানে হামলাকারী অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে সেসবের মধ্যে আছে লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিজ, হারভার্ড, ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট কর্পোরেশন, বোস্টন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস।’ হ্যাঁ, তালিকাটা ঠিকঠাকই লাগছে। অবশ্য, অস্ট্রেলিয়ানদের দল অনুযায়ী ভাবলে আরকি। যদিও ফিনিক্স এগুলোর কোনো কোনোটায় নিজে আক্রমণের পরিকল্পনা করেনি, বা কোনো কোনোটায় আক্রমণও করেনি, কিন্তু টাইমসে সেসবের কৃতিত্ব নিতে পেরে খুশীই হয়েছে।

এই দিনটা ফিনিক্সের অন্যতম সুখের দিন।

তবে, ইলেক্ট্রন যারপরনাই রেগে গেল। ফিনিক্স এতো বোকা কিভাবে হল? ফিনিক্সের অহম, বেশী কথা বলার অভ্যাসের ব্যাপারে সে আগে থেকেই জানত এবং অস্ট্রেলিয়ান হ্যাকারদের আকাশচুম্বী সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে তার দম্ভও বেড়েছিল দ্বিগুণ পরিমাণ। ইলেক্ট্রন এসবকিছুই জানত, কিন্তু তবুও তার বিশ্বাস হতে চাইছিল না যে ফিনিক্স এতোদূর পর্যন্ত গেছে।

ফিনিক্সের সাথে সে মিশত। ইলেক্ট্রন ত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল। সে কখনোই ফিনিক্সকে বিশ্বাস করেনি – সেই সাবধানতাই যে সঠিক ছিল তা আজ প্রমাণ হয়ে গেছে। কিন্তু সে ঘন্টার পর ঘন্টা তার সঙ্গে ফোনে কাটাত, যদিও বেশীরভাগ তথ্য একপাশ থেকেই আসত। কিন্তু পত্রিকায় কথা বলতে গিয়ে ফিনিক্স শুধু অবিবেচকের মতো আচরণই করেনি, সে ইলেক্ট্রনের করা কাজ বাগিয়েও নিজে দম্ভোক্তি দেখিয়েছে! ফিনিক্সকে যদি বলতেই হত — যদিও তার মুখটা বন্ধ রাখাই উচিত ছিল — তাহলে যেসব সিস্টেমের ব্যাপারে সে নিজের কৃতিত্ব দাবী করতে পারে শুধুমাত্র সেটুকুই বলে অন্তত এতোটুকু সততা দেখাতে পারত।

ফিনিক্সকে বুঝানোর অনেক চেষ্টাই ইলেক্ট্রন করেছে। ইলেক্ট্রন তাকে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করতেও বলেছিল। সে বারবার সতর্ক হতে বলেছিল। এমনকি প্রত্যেকবার ফিনিক্স’র বালপাকনা বুদ্ধি থেকে নির্গত হোমড়াচোমড়া লোকেদের পেছনে লাগার প্রস্তাবও সে কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছে। এতোসব কিছু ইলেক্ট্রন করেছে এই আশায় যে ফিনিক্স ইঙ্গিতটা হয়তো ধরতে পারবে। হয়তো, যদি ফিনিক্স উড়ো কথায় কান দিতে নাও চায়, অন্তত তা শোনার তো চেষ্টা করবে। কিন্তু না। ফিনিক্স কখনো সেদিকে কর্ণপাতও করেনি।

ইন্টারনেট চালানো — সেইসাথে, যাবতীয় হ্যাকিং — মাসখানেক না হলেও, কয়েক সপ্তাহের জন্য মাথায় উঠল।  টাইমসের প্রথম পাতার এই খবর এড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার কর্তাব্যক্তিদের চোখ এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ নাই। আমেরিকানরাও তাদের পিছনে লাগবে। স্বার্থপর, বেয়াক্কেল ফিনিক্স সবার ঘুম হারাম করে দিয়েছে।

ইলেক্ট্রন তার মডেমটার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তার বাবার কাছে নিয়ে গেল। আগে পরীক্ষা চলার সময়ও সে তার বাবাকে ওটা সরিয়ে রাখতে বলত। তার নিজেকে সামলে রাখার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা ছিল না এবং কোনোভাবেই ইলেক্ট্রন ওই মডেমে সংযোগ দেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারত না। তার বাবা এই করে করে জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখার ওস্তাদ হয়ে গেছেন, কিন্তু ইলেক্ট্রন তবুও কিছুদিনের মধ্যেই আবার সেই জিনিস খুঁজে খুঁজে বের করে ফেলত। সারাবাড়ি চষে সেই জিনিস খুঁজে বের না করা পর্যন্ত তার মাথায় ওই একটা জিনিসই ঘুরতে থাকত। এমনকি যেবার তার বাবা মডেমটাকে বাড়ির বাইরে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করছিলেন সেবার শুধু খুঁজে পেতে একটু দেরি হয়েছিল।