সে সড়ে আসার পর, ধৈর্য ধরে পর্যবেক্ষণের পরও তেমন কিছুই ঘটতে দেখা গেল না। ইলেক্ট্রন আগের মতোই আন্ডাগ্রাউন্ডে সক্রিয় ছিল কিন্তু তাকে কেউই ধরতে পারে নাই। কোনোকিছুই পরিবর্তন হল না। সম্ভবত ফোর্স’র তথ্য ভুল ছিল। ফেডারাল পুলিশ নিশ্চিতভাবেই ইলেক্ট্রনকে এতোদিনে ধরতে পারত যদি তারা সেরকম চাইত। কাজেই ফিনিক্স আবার ইলেক্ট্রনের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে উদ্যত হল। কাজটা খুবই প্রলুব্ধকর। ফিনিক্স তার আগ্রযাত্রায় এবারে ফোর্সের ইগোকে পাত্তা দেওয়ার পক্ষপাতী ছিল না।

১৯৯০ সালের জানুয়ারির দিকে, ইলেক্ট্রন দুর্দান্ত গতিতে হ্যাকিং চালিয়ে যাচ্ছিল। ঘুম ছাড়া আর সবসময়ই সে হ্যাকিং নিয়েই মেতে থাকত, এমনকি ঘুমেও সে হ্যাকিং নিয়েই স্বপ্ন দেখত। সে এবং ফিনিক্স মেলবোর্ন হ্যাকারদের সব অতীতকে পিছে পেলে এগিয়ে চলছিল। ফিনিক্স পাওয়াস্পাইকের চেয়েও এগিয়ে গিয়েছিল, ঠিক যেমন ইলেক্ট্রন এগিয়ে গিয়েছিল ফোর্সের চেয়ে। এক্স.২৫ নেটওয়ার্ক ছাড়িয়ে তারা তখন এমব্রায়োনিক ইন্টারনেটের দিকে ঝুঁকেছিল। এটিও বেআইনি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিবিড়ভাবে ইন্টারনেট প্রবেশের ব্যাপারে নজরদারি চালাত।

এমনকি নোমও, ইউনিক্স অপারেটিং সিস্টেম, যেটি ইন্টারনেটের সাইটগুলোর অন্যতম মূলভিত্তি, তাতে তার বর্ধমান অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ইলেক্ট্রনের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেনি। তার হ্যাকিঙের প্রতি সেই পরিমাণ প্রতিশ্রুতি, সত্যিকার ক্ষুরধার হ্যাকার হবার নেশা কোনোটাই সেভাবে ছিল না। অনেকদিক থেকেই, নোম এবং ফিনিক্সের সম্পর্কটা যেন ইলেক্ট্রন আর পাওয়ারস্পাইকের মধ্যকার সম্পর্কের অনুরূপ ছিল: মূল ব্যান্ডের সহায়ক হিসেবে কাজ করা।

ইলেক্ট্রন কখনো ফিনিক্সকে কাছের বন্ধু ভাবত না, তাবে তারা ছিল সমগোত্রীয়। এমনকি সে ফিনিক্সকে বিশ্বাসও করত না, তার বিরাট মুখ, বিশাল ইগো এবং ফোর্স সাথে গভীর বন্ধুত্ব — সবই তার অসহ্য লাগত। তবে ফিনিক্স ছিল বুদ্ধিমান এবং তার জানার আগ্রহ ছিল। সবথেকে বড় কথা, তার ছিল নেশা। ফিনিক্স সবসময় তথ্য দিতেই থাকত যা ইলেক্ট্রনকে অনুপ্রাণিত করেছিল, যদিও ফিনিক্স যতো তথ্য পেত তারচেয়ে কম তথ্যই সে দিতে পারত।

এক মাসের মধ্যেই, ফিনিক্স এবং ইলেক্ট্রনের মাঝে যখন নিয়মিত যোগাযোগ হতো, এবং গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলোতে তারা ফোনে কথা বলত — কণ্ঠস্বর দিয়ে — সবসময়, কখনো কখনো দিনে তিন বা চার বারেরও বেশী। হ্যাক করেই কথা বলত তারা। পরস্পরের নোট নিয়ে তুলনা করত। তারপর আবার হ্যাক করত। আবার কথা বলতে আসতো, কিছু প্রশ্ন নিয়ে আলাপ করত। তারপর আবার হ্যাক করতে বসে যেত।

সত্যিকার হ্যাকিং মূলত একাই করতে হয়। ফিনিক্সের মত সামাজিক মানুষদের পক্ষে এ এক নিঃসঙ্গ কাজ। বেশীরভাগ হ্যাকাররাই যখন নিঃসঙ্গতা পছন্দ করত, ফিনিক্সের মতো কেউ কেউ, তার অপরের সঙ্গে কথা বলতেও পছন্দ করত। অবশ্যই তা যেকোন মানুষের নয় — তারা তার মতো একই নেশার কদর করতে জানত এবং বুঝত।

‘ক্যাবোডল. ক্যাবুজ, ‘ইলেক্ট্রন বলে চলল, ‘ক্যাব্রিওলেট। ক্যাব্রিওলেট আবার কি জিনিস? তুমি জানো নাকি?’

‘হ,’ ফিনিক্স বলল, তারপর দ্রুত বলল। ‘ঠিক আছে, ক্যাকাও। ক্যাশ। ক্যাচেট…’

‘আমাকে বলো। এইটা কি জিনিস?’ ইলেক্ট্রন ফিনিক্সকে থামিয়ে দিল।

‘ক্যাসিনেশন। ক্যাসু…’

‘তুমি জানো নাকি?’ ইলেক্ট্রন আবারো জিজ্ঞেস করল, কিছুটা অধৈর্য্য হয়ে। যথাীতি ফিনিক্স আসলে যা জানেনা তাও জানার দাবী করে আসছিল।

‘হুম? ও হ্যাঁ,’ ফিনিক্স আমতা আমতা করে জবাব দিল। ‘ক্যাকল, ক্যাকোফোনি….’

ইলেক্ট্রন ফিনিক্সের এই ‘হুম’ এর অর্থ জানে — এই ‘হ্যাঁ’ এর অর্থ হল ‘না, আমি আসলে এটা জানিনা কাজেই এই প্রসঙ্গ থাকুক।’

ফিনিক্সের বেশীরভাগ কথাই বিশ্বাস না করা ইলেক্ট্রনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শক্ত প্রমাণ ছাড়া, ইলেক্ট্রন সবকিছুকেই ভুয়া কথা ধরে নেয়। ব্যক্তি হিসেবে ফিনিক্সকে তার খুব একটা পছন্দ নয়, এবং তার সাথে কথা বলতেও তাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হত। সে তার সহ-হ্যাকার বন্ধু পাওয়াস্পাইকের সঙ্গই বেশী পছন্দ করত।

পাওয়ারস্পাইক ছিল সম্ভাবনাময় এবং সৃষ্টিশীল। তার সঙ্গে ইলেক্ট্রনের বেশ ভালো যেত। হেভি মেটাল পাওয়ারস্পাইকের খুবই পছন্দ ছিল, আর ইলেক্ট্রন পছন্দ করত ইন্ডি ঘরানার সংগীত। কর্তৃত্ববাদের প্রতি তাদের দুজনেরই ছিল প্রবণ ঘৃণা। যেসব কর্তৃপক্ষের জিনিসপত্র তারা হ্যাক করে বেড়াত শুধু তাদেরই নয়, ইউএস নাভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ বা নাসা এসবের প্রতিও ছিল তাদের ঘৃণা, তবে দ্য রেল্ম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নয়। রাজনীতির ব্যাপারে তারা বামপন্থার দিকেই ঝুঁকে থাকত। তবে, কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার বদলে নৈরাজ্যবাদের প্রতি — সামরিক-বাণিজ্যিক জিনিপত্রের বিরোধীতার দিকেই তাদের আগ্রহ বেশী দেখা যেত।

রেল্ম থেকে তাদের বের করে দেওয়ার পর, কিছুদিনের জন্য ইলেক্ট্রন যেন একটু কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। তার ব্যক্তিগত জীবনের ট্রাজেডিও এই কোণঠাসা অবস্থাকে ত্বরান্বিত করেছিল। আট বছর বয়সে, সে তার মাকে লাঙ ক্যান্সারে মারা যেতে দেখেছে। সে অবশ্য তার মৃত্যুর পূর্বের শেষ দুই বছরের অবর্ণনীয় কষ্টের সময়টুকু দেখেনি, কারণ, ভদ্যমহিলা তখন জার্মান ক্যান্সার ক্লিনিকে সাময়িক উপশমের আশায় ভর্তি ছিলেন। তবুও, মৃত্যুর আগে তিনি বাড়ি এসেছিলেন এবং ইলেক্ট্রন তার চলে যাওয়া দেখেছিল।

একরাত্রে যখন হাসপাতাল থেকে ফোন এলো, ইলেক্ট্রন তখন বড়দের কথার স্বর শুনেই বুঝতে পেরেছিল কি হয়েছে। সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। শুনতে পেলো তার বাবা ফোনে কাকে যেন বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। হ্যাঁ, ছেলেটা খুবই আঘাত পেয়েছে। না, ওর বোনটা মোটামুটি ঠিকই আছে। তারও দুই বছরের ছোট বোনটি তখনও বোঝার বয়স হয়নি।

ইলেক্ট্রনের সাথে তার বোনের খুব বেশী সক্ষ্যতা কখনোই ছিল না। তাকে তার অনুভূতিহীন, অবোধলোক বলেই মনে হত — যার জন্মই হয়েছে স্রোতে ভেসে চলার জন্য। কিন্তু তাদের মায়ের মৃত্যুর পর, তার বাবা ইলেক্ট্রনের বোনকেই বেশী আদর করতে শুরু করেন, সম্ভবত তার বিদেহী স্ত্রীর সঙ্গে অনেক মিল থাকার কারণেই। এই ঘটনা ভাই-বোনের মাঝে আরও বেশী জটিলতা তৈরি করেছিল।

ইলেক্ট্রনের বাবা, যিনি হাই স্কুলে ছবি আঁকার শিক্ষক ছিলেন, তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুতে চরমভাবে ভেঙে পড়েন। সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থের সমস্যা সত্ত্বেও, তাদের বিয়েটার মাঝে ছিল গভীর অনুরাগ এবং ভালোবাসা এবং তাদের ছিল সুখের সংসার। ইলেক্ট্রনের বাবার আঁকা ছবিগুলো তাদের বাড়ির প্রতিটা দেয়ালে টাঙানো ছিল, কিন্তু তার স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তিনি তুলি ছেড়ে দিলেন এবং আর কখনো তা ধরেননি। তিনি এসব নিয়ে কথাও বলতেন না। একদিন, ইলেক্ট্রন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল কেন তিনি আর ছবি আঁকেন না। তিনি বাইরে তাকিয়ে ইলেক্ট্রনকে বলেছিলেন যে তিনি ‘তার অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলেছেন।’

ইলেক্ট্রনের দাদী তাদের বাড়িতে চলে এলেন তার পুত্রের দুটি ছোট ছোট বাচ্চার দেখভাল করতে, কিন্তু তাঁর আলঝেইমার হল। বাচ্চারাও তার যত্নআত্তি থেকে বঞ্চিত হল। টিনেজার হিসেবে, ইলেক্ট্রনের মনে হয়েছিল, যে মানুষটা তার নামটাও মনে রাখতে পারে না সে আবার কি দেখাশোনা করবে। অবশেষে, তিনিও নার্সিং হোমে চলে গেলেন।

১৯৮৯ সালের আগস্টে, ইলেক্ট্রনের বাবা ডাক্তার দেখিয়ে বাড়িতে ফিরলেন। কিছুদিন ধরেই তিনি হালকা অসুস্থতা বোধ করছিলেন, কিন্তু, ডাক্তার দেখানোর জন্য গা করছিলেন না। গত পাঁচ বছরে মাত্র একদিন অসুস্থতার ছুটি নেওয়া নিয়ে তার গর্বও ছিল। শেষমেশ, ছুটিরদিনগুলোতে, তিনি একজন ডাক্তারের কাছে গেলে তাকে অনেকগুলো পরীক্ষা করতে দেওয়া হল। তারই ফল এসেছে।

ইলেক্ট্রনের বাবা অন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং সেটা অনেকদূর ছড়িয়েও পড়েছে। নিরাময়ের কনো উপায় নাই। বড়জোর আর দুই বছর বাঁচবেন।

তখন ইলেক্ট্রনের বয়স ছিল ঊনিশ, এবং কম্পিউটারের সাথে, বিশেষ করে মডেমের সাথে তার প্রথম প্রণয় চলছিল, যা ইতিমধ্যেই একটা নেশায় পরিণত হয়েছে। বেশ কয়েকবছর আগে তার বাবা, নতুন যন্ত্রপাতির প্রতি তার আগ্রহ বাড়াতে, সপ্তাহান্তে বা ছুটিরদিনগুলোতে স্কুলের একটি এপল টুইএস কম্পিউটার বাড়িতে নিয়ে আসতেন। সেই ভাড়া করা কম্পিউটারেই ইলেক্ট্রন ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ব্যয় করত। সে কম্পিউটারে খেলত না, সে পড়তো, কখনো তার বাবার ঘিঞ্জি বইয়ের তাক থেকে কোনো গোয়েন্দা উপন্যাস পড়ে নিয়ে বা কখনো তার নিজের প্রিয় বই , লর্ড অফ দ্য রিংস।

তার প্রথম কম্পিউটার আসার আগেই কম্পিউটার প্রোগ্রামিং তার কল্পনার জগতকে প্রভাবিত করে ফেলে। কির্বোর্ড ছোঁয়ার আগেই, মাত্র এগারো বছর বয়সে সে বই দেখে দেখে কাগজে ছোটোখাটো প্রোগ্রাম লেখার চেষ্টা করত।

তার স্কুলে সম্ভবত কয়েকটা কম্পিউটার ছিল, কিন্তু সেগুলোর পরিচালকেরা সেগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে খুবই কম জানতো। নাবম বর্ষে পড়ার সময়, স্কুলের ক্যারিয়ার কাউন্সেলরের সাথে কথা বলার সময়, ইলেক্ট্রন কম্পিউটার নিয়ে কাজ করার কথা বলেছিল।

‘আমার কম্পিউটার প্রোগ্রামিং নিয়ে কোনো কোর্স করতে খুব ভালো লাগবে…’ সে একটু দ্বিধামাখা কণ্ঠে সে বলেছিল।

‘কেন তুমি এটা করতে চাও?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। ‘এরচেয়েও ভালোকিছু চিন্তা করতে পারছো না?’

‘হুমম…’ ইলেক্ট্রন দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল না কি করবে। সেইজন্যই তো সে তার কাছে এসেছে। সে গতানুগতিক কোনো কাজের চেয়ে আলাদা কিছু পছন্দ করতে চেয়েছিল, যেখানে কম্পিউটার নিয়ে কাজ করা সুযোগ রয়েছে। ‘আচ্ছা, তাহলে হয়তো একাউন্টিং?’

‘বেশ বেশ, এটা অনেক ভালো কথা।’ তিনি জানালেন।

তিনি হেসে আরও বললেন, ‘তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখানে একাউন্টিং নিয়ে পড়তে পারবে। আমার নিশ্চিত তোমার ভালো লাগবে।’ এবং তার ফাইল বন্ধ করে দিলেন।

ইলেক্ট্রনের মতে, ধার করে নিয়ে আসা কম্পিউটারগুলোই স্কুলের একমাত্র ভাল জিনিস ছিল। সে স্বাভাবিকভাবেই স্কুলে খুব ভালো করত, কিন্তু তার কারণ হল এসব করতে তাকে খুব বেশী বেগ পেতে হত না। শিক্ষকেরা বারবার তার বাবাকে বলত যে, ইলেক্ট্রন বেশ অমনোযোগী এবং সে অন্যান্য ছাত্রদেরও বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে। বেশীরভাগ সময়ই, আড়ালে তার সমালোচনা চলত। কখনো কখনো, ইলেক্ট্রনের সঙ্গে শিক্ষকদের ঘোরতর গন্ডগোল লেগে যেত। কেউ কেউ ভাবতেন সে প্রতিভাবান। আবার কেউ কেউ ভাবতেন, দাগওয়ালা, আইরিশ চেহারার ছেলেটা যে কিনা তার বন্ধুদেরকে ক্লাসের পেছনে নিয়ে পড়ার বইপত্রে আগুন ধরিয়ে দিতে সাহায্য করে সে একটা সুন্দর গাধা ছাড়া আর কিছুই নয়।

তার বয়স যখন ষোল, তখন সে তার প্রথম কম্পিউটারটি কেনে। সে এটা ব্যবহার করে সফটওয়্যারের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভাঙতো, ঠিক পার যেমনটা করত। এপলের জায়গায় দ্রতই একটা আরও শক্তিশালী, ২০ মেগাবাইটের আইবিএমের উপযুক্ত সাইডকারযুক্ত এ্যামিগা এলো। দুটি কম্পিউটারই, তার শোবার ঘরের দুটি টেবিলের একটিতে পাশাপাশি রাখা ছিল। দ্বিতীয় টেবিলে, তার স্কুলের কাজের জন্য সাধারণত অস্পৃশ্য সব এসাইনমেন্টের স্তুপ গাদা করে রাখা থাকত।

ইলেক্ট্রনের ঘরের সবথেকে চোখে লাগার মতো ব্যাপারটি হল সারা মেঝেতে ছড়ানো রিমের পর রিম প্রিন্ট করে রাখা ডট-ম্যাট্রিক্স প্রিন্টারের কাগজ। ঘরের যেকোন এককোণায় দাঁড়িয়ে যেকেউ অনায়াসে অন্ততপক্ষে একতাড়া প্রিন্ট করা কাগজ ধরতে পারবে, যেগুলোর বেশীরভাগের মধ্যেই ছিল অসংখ্য ইউজারনেম, পাসওয়ার্ড এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামের কোড। প্রিন্ট করা কাগজের স্তুপগুলোর মাঝে মাঝে ছিল টি-শার্ট, জিন্স, স্নিকার এবং মেঝেতে ছড়ানো বই। কোনোকিছুকে না মাড়িয়ে ইলেক্ট্রনের ঘরে নড়াচড়া করা ছিল এক অসম্ভব ব্যাপার।

১৯৮৬ সালে একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড ৩০০ বডের মডেম কেনাটাই ছিল ইলেক্ট্রনের জীবনের অন্যতম বাঁক। একরাতের মধ্যেই, সেই মডেম কম্পিউটারের প্রতি ইলেক্ট্রনের ভালোবাসাকে নেশায় পরিণত করে ফেলেছিল। মডেম আসার সময়কার সেই সেমিস্টারে ইলেক্ট্রনের ফলাফল কার্ডে দখা গেল সে ছয়টা এ এবং একটা বি পেয়েছে। তারপরের সেমিস্টারে সে ছয়টা বি এবং একটিমাত্র এ পেয়েছিল।

স্কুলের চেয়েও বড় এবং ভাল জিনিস ইলেক্ট্রন পেয়ে গিয়েছিল। অল্পদিনেই সে আন্ডারগ্রাউন্ড বিবিএসগুলোর নিয়মিত সদস্য হয়ে গিয়েছিল এবং হ্যাকিং শুরু করে দিয়েছিল। একবার একটা আর্টিকেলে কিছু হ্যাকার দাবী করেছিল যে তারা শুধুমাত্র কম্পিউটার হ্যাক করেই মহাশুন্যের মাঝে একটা স্যাটেলাইটকে নড়াচড়া করিয়েছিল। এই আর্টিকেল দেখে সে মোহিত হয়ে গিয়েছিল। সেই মুহূর্ত থেকেই, ইলেক্ট্রন স্থির করেছিল যে সে হ্যাক করবে – আর্টিকেলটা সত্য বলছে কিনা যাচাই করে দেখবে।

১৯৮৭ সালে স্কুল থেকে পাশ করে বেরোনোর আগেই, ইলেক্ট্রন নাসা হ্যাক করেছিল। সেটা এমনই একটা সাফল্য ছিল যে সে মাঝরাতে খাবার ঘরের চারপাশে নেচে নেচে ‘নাসায় ঢুকতে পেরেছি! নাসায় ঢুকতে পেরেছি!’ বলে চেঁচিয়ে বেড়িয়েছিল। সে কোনো স্যাটেলাইটকে নড়িয়ে দেয়নি বটে, তবে মহাকাশ সংস্থার ভিতরে ঢুকতে পারাটা ছিল চাঁদে ঘুরে বেড়ানোর মতোই উত্তেজক ব্যাপার ছিল।

১৯৮৯ সালের দিকে, সে তখন টানা কয়েকবছর ধরে হ্যাক করে চলছিল, বিশেষ করে তার বোনের সঙ্গে তুমুল কাইজা সত্ত্বেও, যে কিনা অভিযোগ করেছিল যে, তাদের বাসার ফোনের লাইন সবসময় মডেমের সঙ্গে বাঁধা থাকায় তার সামাজিক জীবন নষ্ট হচ্ছে।