নিঃসন্দেহে এটা একটা শক্তিশালী প্রত্যয়। সেই আমলের কম্পিউটার আন্ডারগ্রাউন্ডের একজন সদস্যের সামনে ‘টেলিকম’ শব্দটা একবার উচ্চারণ করেই দেখুন না, তার কী প্রতিক্রিয়া হয়। তার মুখে সাথে সাথে একটা অবজ্ঞার ভাব ফুটে উঠবে। ক্ষণিক থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে টিটকারির মত মত ভঙ্গী করে ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলবেন, ‘টেলিস্কাম!’। অস্ট্রেলিয়ার এই সরকারি টেলিফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে তারা যতটা ঘৃণা করত, এই প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগুলোকে আবার তারা ঠিক ততোটাই ভালোবাসত। তারা মনে করত টেলিকম একটা মান্ধাতার আমলের প্রতিষ্ঠান এবং এর কর্মচারীরা জানেও না টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তিকে কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হল, টেলিকমও যেন বিসিএসগুলোকে একরকম প্রকাশ্যেই অপছন্দ করত।

লাইন নয়েজের জন্য মাঝে মাঝে মডেম দিয়ে কথা বলার মাঝে ছেদ পড়ত। কম্পিউটার আন্ডারগ্রাউন্ডের চোখে, লাইন নয়েজের জন্য দায়ী হল টেলিকম। কোনো হ্যাকার হয়তো পাইতে একটা বার্তা পড়ছেন, এর মধ্যে কোনো কারিগরি গণ্ডগোলের কারণে এলোমেলো সংখ্যা, যেমন: ‘২’২৮ভ১;ড>নজ৪’ – ভেসে উঠল। ওমনি শুরু হয়ে যেত, ‘লাইন নয়েজ! বালের টেলিস্কাম! এই একটা কাজই তারা ভালো পারে, নাকি?’ কখনো কখনো লাইন নয়েজ এত খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করত যে বাধ্য হয়ে হ্যাকারকে লগ অফ করতে হত। এর মানে হল, তাকে আবার ৪৫ মিনিট ধরে বিসিএসে ডায়াল করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আসলে সংযোগে কোনো সমস্যা ছিল না। মডেমের গতি যত বেশী হবে, লাইন নয়েজের প্রভাব ততো কমতে থাকবে – সেটাই স্বাভাবিক। তাই, লাইন নয়েজ শুরু হওয়ার আগেই মেইল পড়া এবং বার্তা পোস্ট করার হুল্লোড় পড়ে যেত।

তবে একটা গুজব বারবার ছড়াতো। সেটা হল, টেলিকম সময়-নির্দিষ্ট স্থানীয় কলব্যবস্থা আনতে যাচ্ছে। আর সেই ক্ষোভে কানে তালা লাগার জোগাড় হল । বিবিএস কমুনিটির ধারণা ছিল, মানুষ স্থানীয় কলের পয়সায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিবিএসে লগইন করে থাকায় সরকারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটি বোধহয় বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। আরও উদ্ভট যেসব গুজব ছড়িয়েছিল সেগুলোর মধ্যে একটা হল, টেলিকম বিবিএসগুলোকে তাদের ইনকামিং কলের সময়সীমা আধাঘন্টায় বেঁধে দিতে বাধ্য করেছে। এতে আন্ডারগ্রাউন্ডে টেলিকমের কপালে আরেকটা নাম জুটলো: টেলিপ্রফিট।

টেলিকমের প্রটেক্টিভ সার্ভিস ইউনিটই ছিল বিবিএস কমুনিটির প্রধান শত্রু। এরা হল ইলেক্ট্রনিক পুলিশ। আন্ডারগ্রাউন্ড, প্রটেক্টিভ সার্ভিসকে ‘দমনকারী প্রতিষ্ঠানের’ নজরে দেখত। এরা হল সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সরকারি বাহিনী যারা বাড়ি ঘেরাও করতে পারে, ফোনে আড়ি পাততে পারে এবং যেকোনো সময় কম্পিউটারসামগ্রী জব্দ করতে পারে। টেলিকমকে ঘেন্না করার এটাই ছিল আসল কারণ।

টেলিকম নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডের বাসিন্দাদের এতোই ঘৃণা ছিল যে, তারা প্রায়ই তাদের যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে নষ্ট করে দেওয়ার ফন্দিও করত। কেউ কেউ টেলিফোন লাইন দিয়ে ২৪০ ভোল্টের বিদ্যুৎ পাঠানোর চিন্তা করতো – ভাবখানা এমন যেন এই কাজ করতে পারলে টেলিফোন এক্সচেঞ্জগুলো তাদের কর্মচারী সমেত বিস্ফোরণে উড়ে যাবে। টেলিকমে বিদ্যুৎ প্রতিরোধী ফিউজ ছিল, যেসবের কাজ হল লাইনের গণ্ডগোল প্রতিরোধ করা । কিন্তু, জনশ্রুতি ছিল যে, বিবিএস হ্যাকাররা এমন সার্কিট প্ল্যান তৈরি করেছে, যেটা দিয়ে উচ্চ কম্পাঙ্কের ভোল্টেজ পাঠানো সম্ভব। আর, বেচারা গোছের আন্ডারগ্রাউন্ড সদস্যরা ভাবত টেলিফোন এক্সচেঞ্জগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিলে কী মধুর প্রতিশোধই না হবে!

এগুলোর কোনোটাই অবশ্য ফ্রিকিং সংস্কৃতির কারণ নয়। টেলিফোন সিস্টেম হ্যাক করাই হল ফ্রিকিং – এই সংজ্ঞা অত্যন্ত দুর্বল। কেউ কেউ মনে করেন ক্রেডিটকার্ড চুরি করে সেটা দিয়ে বিনা পয়সায় লং-ডিসট্যান্স কল করাও একধরনের ফ্রিকিং। পিওরিস্ট ধারার হ্যাকাররা আবার এর সাথে একেবারেই একমত নন। তারা বলেন, চুরি করে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করাকে বরং কার্ডিং বলা যায়, ফ্রিকিং নয়। তাদের যুক্তি হল, ফ্রিকিঙের জন্য ন্যূনতম কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন হয় এবং টেলিফোন এক্সচেঞ্জে হস্তক্ষেপ করার দরকার পড়ে। আর, এই হস্তক্ষেপ হতে পারে কম্পিউটার বা ইলেক্ট্রিক্যাল সার্কিট ব্যবহার করে টেলিফোনের বিশেষ টোন উৎপাদন করে, বা, ফোন লাইনের ভোল্টেজের পরিবর্তন করার মাধ্যমে। ফলাফল: বিনামূল্যে, আনট্রেসড কলসুবিধা। পিওরিস্ট ধারার হ্যাকারেরা ফ্রিকিং কে বিনা পয়সায় কল করার সুবিধা হিসেবে না দেখে বরং নজরদারী এড়িয়ে কল করার সুবিধা হিসেবেই দেখতে চাইত।

১৯৮৮ সালে ফ্রিকিঙের প্রথম সূত্রপাত। ধীরে ধীরে তা কার্ড জালিয়াতির দিকে মোড় নেয় এবং ছয় মাসের মধ্যে বিকশিত হয়ে ওঠে। পাই এবং জেনের প্রথমদিককার হ্যাকাররা আন্তর্জাতিক কম্পিউটার সাইটগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য প্রধানত মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় আর টেলিকমের ক্লেটন অফিসের ডায়াল-আউটের উপরেই নির্ভর করত। সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াতে তারা আমেরিকা, সুইডেন এবং জার্মানির মত বিভিন্ন দেশের এক্স.২৫ ডায়াল আউট ব্যবহার করার ঝুঁকিও নিত।

আস্তে আস্তে, এইসব ডায়াল-আউট নিয়ন্ত্রকদের চোখ ফুটতে লাগল। তাছাড়া, ডায়াল আউটের আবেদন ফুরিয়ে যেতে থাকল। পাসওয়ার্ডও পরিবর্তন হতে লাগল। সুবিধাগুলোও তুলে নেওয়া হল। কিন্তু হ্যাকাররা বিদেশী সিস্টেমে ঢোকা বন্ধ করতে চাইল না। তারা একবার যেহেতু  আন্তর্জাতিক কল করার স্বাদ পেয়েই গিয়েছে, কাজেই তাদের সাধও বেড়ে গিয়েছিল। একটা বিরাট আকর্ষণীয় ইলেক্ট্রনিক দুনিয়া ঐ প্রান্ত থেকে তাদের হাতছানি দিত। তারাও সেখানে যাবার জন্য নানান ধরনের পদ্ধতি খুঁজতে লাগল। এবং, এইভাবেই মেলবোর্ন আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্রিকিঙের দুনিয়ায় প্রবেশ করল।

ফ্রিকাররা মৌমাছির মত পিএবিএক্সগুলোর কাছে ভনভন করত। পিএবিএক্স বা প্রাইভেট অটোমেটিক ব্রাঞ্চ এক্সচেঞ্জ, ছোটখাটো টেলিকম এক্সচেঞ্জের মতোই। পিএবিএক্স ব্যবহার করে কোনো বড় কোম্পানির কর্মকর্তারা কোম্পানির ভিতরেই অপর কর্মকর্তাকে বিনা পয়সায় ফোন করতে পারতেন। তাছাড়া, কোনো কর্মকর্তা যদি শহর থেকে দূরের কোনো হোটেলে থাকেন, কোম্পানি সেক্ষেত্রে হোটেলের লং-ডিসটেন্স কলের বাড়তি বিল এড়ানোর জন্য তাকে কোম্পানির পিবিএক্স ব্যবহার করেই যাবতীয় কল করার সুযোগ করে দিতে পারত। যদি ওই কর্মচারী ব্যবসার কাজে ব্রিসবেনে অবস্থান করেন, তাহলে তিনি ব্রিসবেনের কোনো নম্বরে সিডনিতে রাখা কোম্পানির পিএবিএক্সের মাধ্যমে ডায়াল করতে পারতেন। সেখান থেকে তিনি যদি রোম বা লন্ডনেও ডায়াল করেন, সেক্ষেত্রে সরাসরি কোম্পানির কাছ থেকেই বিল কেটে নেওয়া হবে। আর, সহজেই বলা যায়, যা কর্মকর্তার ক্ষেত্রে কাজ কর, সেটা ফ্রিকারের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই কাজ করবে।

পিএবিএক্সে ডায়াল করতে ফ্রিকারকে হয় পাসওয়ার্ড জানতে হত অথবা আন্দাজ করতে হত। এই পাসওয়ার্ডই তাকে ডায়াল-আউট করার সুযোগ করে দিত। কখনো কখনো অটোমেটেড মেসেজের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানিয়ে কর্মকর্তাকে কাঙ্ক্ষিত টেলিফোন এক্সটেনশন জিজ্ঞেস করলে যে নম্বর বলতে হত, সেই নম্বরও অনেকসময় পাসওয়ার্ড হিসেবে কাজ করত। মোটকথা, কাজটা মোটামুটি সহজই ছিল। ফ্রিকার যথারীতি সঠিক নম্বর না পাওয়া পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে নম্বর বলে যেত।

হঠাৎ হঠাৎ পাসওয়ার্ডবিহীন পিএবিএক্সও পাওয়া যেত। ঐসব পিএবিএক্সের ম্যানেজারেরা বোধহয় ভাবতেন, ফোননম্বর গোপন রাখলেই যথেষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। কিছু কিছু নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড অথবা মডেলের পিএবিএক্সের নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে বের করে সেটা কাজে লাগিয়েও কখনো কখনো ফ্রিকাররা বিনামূল্যে কল করতে পারত। নির্দিষ্ট কিছু বোতাম চেপেও অনেকসময় পাসওয়ার্ড, কর্মচারীর নাম এমনকি কোম্পানির নাম ছাড়াই ফ্রিকাররা ঢুকে পড়তে পারত।

ক্রমে সময় কাটানোর আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে ফ্রিকিং, হ্যাকিংকে ছাড়িয়ে যেতে লাগল। ফলে, পাইও একটা প্রাইভেট ফ্রিকিং সেকশন খুলল। কিছুদিনের মধ্যে, নিজেকে হ্যাকার বলে পরিচয় দেওয়া পুরাতন ফ্যাশনে পরিণত হল। ফ্রিকিংই নতুন দুনিয়ার সন্ধান দিল।

এইরকম একটা রূপান্তরের মাঝেই ফ্রিকার্স ফাইভের উদয় হয়েছিল। পাইয়ের একটা স্বতন্ত্র গ্রুপ হিসেবে হ্যাকার থেকে ফ্রিকার হয়ে ওঠা পাঁচজনের একটা দল আত্মপ্রকাশ করে। মাঝরাতে তাদের পডিং অভিযানের গল্পগুলো বিবিএসের অন্যান্য সেকশনগুলোতেও ফাঁস হয়ে গেল এবং উঠতি ফ্রিকারদের তা রীতিমত ঈর্ষান্বিত করতে শুরু করল।

ফ্রিকাররা প্রথমেই টেলিফোন পড খুঁজে বের করত। ছাইরঙা, গোলাকার বাক্সগুলো সাধারণত বিভিন্ন রাস্তার উপরে বসানো থাকত। রাতেরবেলা যেসব জায়গা পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায়, সেসব জায়গার পডগুলো ফ্রিকিঙের জন্য আদর্শ। যেমন: পার্ক বা কোনো খোলা জায়গা। শহরতলীর বসতবাড়িগুলোর একদম সামনে বসানো পডগুলো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ – এইসব বাড়িতেই সাধারণত ঘাঘু মহিলারা থাকে যারা একটু বেগড়বাই দেখলেই ফট্ করে পুলিশে ফোন দিয়ে বসে। এরা দড়ি দেখলেও সেটাকে সাপ বানিয়ে তুলকালাম বাঁধাবেই।

শুরুতেই দলের কেউ একজন ভ্যান থেকে নেমে গিয়ে কোনো টেলিকম কারিগরের কাছ থেকে ধার করা অথবা চুরি করা চাবি দিয়ে পড খুলত। এই চাবিগুলো জোগাড় করা মোটামুটি সহজই ছিল। কোনো মিস্ত্রীর কাছ থেকে বৈধভাবে অথবা ছয় বোতল বিয়ারের বিনিময়ে টেলিকমের মূল্যবান জিনিসপত্র, যেমন: ৫০০ মিটার তার অথবা পড-কি ইত্যাদি সংগ্রহ করার গল্পে তখনকার বিবিএসের মেসেজবোর্ডগুলো মশগুল থাকত।

এরপর সেই ফ্রিকার পডের ভেতর হাতড়ে হাতড়ে ফোন লাইন খুঁজে বের করত। যদি ভয়েস কল করা তার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রথমেই সে তারটাকে ছিঁড়ে এলিগেটর ক্লিপ দিয়ে বাঁধত। এরপর টেলিকম থেকেই ধার করা, কেনা, অথবা চুরি করে নিয়ে আসা লাইনম্যানদের হ্যান্ডসেট বের করে লাগিয়ে দিত। আর যদি কথা বলা বাদে অন্য কোনো কম্পিউটারে কল করাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে একগোছা তার দিয়ে সে সংযোগটাকে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করত। আর এই কাজটা করতেই মূলত টেলিকমের ৫০০মিটার তার দরকার হত। লম্বা তার হলেই পাঁচজন উত্তেজিত তরুণকে আর ফিসফিসও করতে হতো না, আর এক দঙ্গল যন্ত্রপাতি নিয়ে পডের নীচে ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়েও থাকতে হত না। কারণ, এই ধরনের দৃশ্য রাতেরবেলা কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হওয়া স্থানীয়দের কাছে সন্দেহজনক মনে হওয়া বিচিত্র নয়।

যদি সম্ভব হত, তাহলে ফ্রিকার রাস্তার ওপর দিয়ে তার টেনে এক কোণায় নিয়ে চলে যেত। তারপর সেটাকে গাড়ির ভিতর ঢুকিয়ে কম্পিউটার মডেমের সঙ্গে জুড়ে দিত। ওই পাঁচজনের অন্তত একজনের ইলেক্ট্রিক হার্ডওয়্যারের ব্যাপারে ভাল দক্ষতা থাকত। সে গাড়ির ব্যাটারির সঙ্গে কম্পিউটার এবং মডেম জুড়ে দিত। আর ফ্রিকার্স ফাইভ তখনই বিল ফাঁকি দিয়ে এবং কোনোরকম হদিস ছাড়াই যেকোনো কম্পিউটারে কল করতে পারত। টেলিকম তখনো বাসাবাড়ির টেলিফোনের জন্য আলাদা বিলব্যবস্থা তৈরি করেনি। সেইসব দিনগুলোতে মাঝরাতে হাতে এলিগেটর ক্লিপ, ব্যাটারি এডাপ্টর আর কম্পিউটার নিয়ে শহরতলীর রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়ানো সত্যিই একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার ছিল, কিন্তু, তাতে কারো কিছু আসত-যেত না। আসলে, গুপ্তচরদের মত এইরকম অভিযানের রোমাঞ্চ হ্যাকিঙের চেয়ে কোনো অংশে কম মজাদার ছিলনা। কাজটা নিষিদ্ধ। কিন্তু, ফ্রিকারদের চোখে, জিনিসটা যথেষ্ট কৌশলী। তাই, করতেও মজা।

ক্রেগ বাওয়েন কখনো ফ্রিকার্স ফাইভের মত ফ্রিকিঙয়ের কথা ভাবেনাই। সত্যি বলতে, সময় কাটানোর জন্য ফ্রিকিংয়ের চর্চা তাকে কিছুটা হতাশই করেছিল। তার মনে হত, ওই কাজটার জন্য সত্যিকার হ্যাকিং দক্ষতার কোনো দরকার নাই। তার চোখে হ্যাকিং হল, কম্পিউটারের আনকোরা নতুন দুনিয়ার অনুসন্ধান চালানো। আর ফ্রিকিং, হ্যাকিঙের চেয়ে কিছুটা নীচুমানের কাজ। কোনোভাবে এটা হাতের কাজকে ছোট করে ফেলে।

তবুও, সে বুঝতে পারত, হ্যাকিং অব্যাহত রাখার স্বার্থেই কখনো কখনো ফ্রিকিঙও জরুরী হয়ে দাঁড়ায়। আন্ডারগ্রাউন্ডের বেশীরভাগ সদস্যই ন্যূনতম ফ্রিকিঙ কৌশল শিখে নিতে শুরু করেছিল, যদিও বাওয়েনের মত লোকেদের চোখে বিষয়টা ‘ইধারকা মাল উধার’ করার চেয়ে বেশীকিছু ছিলনা। তবুও, সে পাইয়ের প্রাইভেট সেকশনে ফ্রিকিং বিষয়ক আলোচনায় সায় দিয়েছিল।

তবে সে ক্রেডিটকার্ড জালিয়াতি নিয়ে আলোচনাকে প্রশ্রয় দিত না। কার্ড জালিয়াতি বাওয়েনের কাছে গর্হিত কাজ বলে মনে হত, এবং, কোনো কোনো সদস্য ফ্রিকিং থেকে কার্ড জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েছে দেখলে সে খুবই ভয় পেত।

হ্যাকিংয়ের চর্চা ফ্রিকিংয়ে রূপান্তরের পেছনে যেমন যুক্তি ছিল তেমনি, কার্ড জালিয়াতির চল হওয়ার পেছনেও অত্যন্ত যৌক্তিক কিছু ঘটনা ছিল। ১৯৮৮ সালের ছয়মাসের মধ্যেই রাতারাতি এসব রূপান্তর ঘটতে থাকে এবং বরাবরের মত এবারও এসবের পেছনে বাচ্চাকাচ্চারাই জড়িত ছিল।

অনেক ফ্রিকারই এটাকে আরেক ধরনের ফ্রিকিং হিসেবেই নিয়েছিল। সত্যি বলতে, কোম্পানির পিবিএক্সে ঢোকার চেয়ে এই কাজটা বহুগুণে সহজ। অতো হ্যাপার বদলে শুধুমাত্র অপারেটরকে কল দিয়ে বিল পরিশোধের জন্য অপরিচিত কয়েকজন মানুষের ক্রেডিটকার্ড-নম্বর দিয়ে দিলেই হয়ে যেত। অবশ্যই, ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পিএবিএক্সের চেয়েও বড় বড় কাজ করা যেত। কার্ডিঙের সুবিধা হল, এতে আপনি আমেরিকা বা যুক্তরাজ্যের মত দেশেও বন্ধুদের কল করতে পারবেন এবং প্রত্যেকের সঙ্গেই ভয়েস কনফারেন্সে কথাও বলতে পারবেন – যেটা পিএবিএক্স দিয়ে করা খুবই কঠিন কাজ। আরো অনেক সুবিধা ছিল। ক্রেডিটকার্ড দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্রের দামও মেটানো যেত। বিভিন্ন পণ্য অর্ডারও করা যেত।

ইভান ট্রটস্কি হ্যান্ডেল নামে একজন আন্ডারগ্রাউন্ড সদস্যের নামে একবার ৫০০০০ ডলার মূল্যের পণ্য অর্ডারের অভিযোগ উঠেছিল, যার মধ্যে একজোড়া জেট স্কিও ছিল। চোরাই আমেরিকান একটা কার্ড দিয়ে সে এসব অর্ডার করেছিল শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ার ডকে সেগুলো ফেলে রাখার জন্য। কাস্টমসের লোকজন তো আর চোরাই কার্ড থেকে বিল নেবেনা। আরেকটা ঘটনায় ট্রটস্কি বেশ কিছুদূর সফলও হয়েছিল বলে জানা যায়। তো, সেই লোকদেখানো ভুয়া হ্যাকার ট্রটস্কি, তার কম্পিউটার টার্মিনালের পাশে কার্ল মার্ক্স আর লেনিনের ছবি লাগিয়ে রাখত আর আন্ডারগ্রাউন্ডে নিয়মিত কমুনিস্ট মতাদর্শের কথা বলে বেড়াত। সেই মুখচোরা, স্ববিরোধী ছেলেটা, অস্ট্রেলিয়ার কমুনিস্ট পার্টির সভাতেও যেত, আবার হাঁসও শিকার করত। জনৈক হ্যাকারের ভাষ্যে, পুঁজিবাদী নিয়মকানুনকে ভাঙতে ট্রটস্কির ভূমিকা হল আমেরিকান চোরাই ক্রেডিটকার্ড ব্যবহার করে দামী দামী মডেমের অর্ডার দেওয়া। শোনা যায়, সে নাকি কম্পিউটার কমুনিটিতে ওইসব মডেম প্রতিটা ২০০ ডলাতে বিক্রিও করেছিল। আপাতদৃষ্টে, কমুনিস্ট বিপ্লবের সাথে সম্পৃক্ততা থাকার কারণে  এইসব কাজ হালাল করার জন্য কিছু রেডিমেড বুলিও সে পেয়ে গিয়েছিল। সদস্যপদ থাকার এই হল সুবিধা।

বাওয়েন কার্ডিঙকে চুরির চেয়েও ঘোরতর ব্যাপার মনে করত। হ্যাকিঙের পেছনে নৈতিক কারণ থাকতে পারে, কিন্তু তবুও, ১৯৮৮ সালের শুরুতেও অস্ট্রেলিয়ায় কাজটা বৈধ ছিলনা। অপরদিকে, কার্ডিং একইসাথে অনৈতিক এবং অবৈধ। হ্যাকিংকে কেউ কেউ এক ধরনের চুরি হিসেবে দেখে থাকে তা বাওয়েন মানত। মানে, কারো কম্পিউটার থেকে তথ্য চুরি করা – কিন্তু, এরকম ধারণার পেছনে পরিষ্কার যুক্তি তাদের ছিলনা। যদি রাত দুটোর সময় কারো ওই তথ্যগুলোর প্রয়োজন না থাকে, সেক্ষেত্রে কী হবে? একে অব্যবহৃত সম্পদ বা বড়জোড় ‘ধার করা’ বলা যেতে পারে, কারণ, হ্যাকার তো আর সারাজীবনের জন্য কোনো সম্পত্তি হাতিয়ে নেন নাই। কিন্তু, কার্ডিংয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টা সেরকম নয়।

তা বাদেও যে ব্যাপারটা কার্ডিংয়ের ভাবমূর্তি আরো খাটো করেছিল তা হল, এর জন্য চাবি দেওয়া খেলনা চালানোর মত কারিগরি দক্ষতা থাকলেই চলত। এটা শুধুমাত্র ভালো ভালো হ্যাকারদেরই ছোট করে নাই, কিছু ভুল মানুষকেও হ্যাকিংয়ের জগতে টেনে নিয়ে এসেছিল। এরা অস্ট্রেলিয়ার আন্ডারগ্রাউন্ডের প্রচলিত রীতিনীতি: কম্পিউটার সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে কোনো অনিষ্ট না করা ( যেমন: ক্রাশ করিয়ে দেওয়া হতে বিরত থাকা); সিস্টেমের তথ্য পরিবর্তন না করা (আলামত মুছে দেওয়ার জন্য লগ পরিবর্তন করে দেওয়া বাদে); এবং, অন্যদের সাথে তথ্য বিনিময় করা – এসব নিয়মের প্রতি হয় কম শ্রদ্ধা দেখাত অথবা একেবারেই তোয়াক্কা করত না। অস্ট্রেলিয়ার পুরনো হ্যাকারদের কাছে, অচেনা কারো সিস্টেমে ঘুরে বেড়ানো অনেকটা সরকারি পার্কে ঘুরে বেড়ানোর মত ব্যাপার ছিল। কাঙ্ক্ষিত জিনিস পাওয়ামাত্র বেরিয়ে যাওয়াই ছিল নীতি।

হ্যাকিং হায়ারার্কিতে ভাল জিনিসগুলো যেমন উঠে আসছিল তেমনি কার্ডিং কমুনিটিতে উঠে আসছিল অবাঞ্ছিত লোকের দল। ব্লু থান্ডারের চেয়েও উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছিল কেউ কেউ। ব্লু থান্ডার ১৯৮৬ সাল থেকে মেলবোর্নের আন্ডারগ্রাউন্ডে ঢোকার জন্য ছোঁকছোঁক করছিল। সিনিয়র হ্যাকাররা তাকে ব্লু ব্লান্ডার ডেকে হাসাহাসি করতেন। তার আন্ডারগ্রাউন্ডে ঢোকার ঘটনা অনেকটা ধনীর আদুরে দুলালীর বলরুমের অভিজাত পরিবেশের মাঝে আছাড় খাওয়ার মতোই; অত্যন্ত লজ্জাজনক। সে মেলবোর্ন আন্ডারগ্রাউন্ডের সবচেয়ে সম্মানিত নারীর সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল।

আন্ডারগ্রাউন্ডে দ্য রিয়াল আর্টিকেলের বিশেষ কদর ছিল। বলতে গেলে, দ্য রিয়াল আর্টিকেলই হলেন প্রথম নারী – বা বলা যায় একমাত্র নারী যিনি মেলবোর্ন আন্ডারগ্রাউন্ডের দুনিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও তিনি কম্পিউটার হ্যাক করতেন না, কিন্তু সেসব সম্পর্কে তাঁর অগাধ জানাশোনা ছিল। তিনি দ্য রিয়াল কানেকশন চালাতেন। পাইতে যেসব হ্যাকার ঘোরাঘুরি করত, এটা তাদের মাধ্যমেই চলত। তিনি বয়ফ্রেন্ডের সন্ধানে ফুড়ুৎ করে উড়ে আসা কারো বোন নন। তাঁর বয়স অনেক। তিনি ছিলেন বিবাহিত। তাঁর বাচ্চাকাচ্চাও ছিল। হ্যাকিং কমুনিটি তাঁকে অন্যতম প্রভাবশালী লোক হিসেবে গুণতিতে ধরত।

মোদ্দাকথা, দ্য রিয়াল আর্টিকেল আন্ডারগ্রাউন্ড জুড়ে ভালো প্রতিপত্তি নিয়ে চলতেন। এই প্রতিপত্তির একটা নিদর্শন হল, হ্যাকএর সদস্যরা তাঁকে তাদের সম্মানসূচক সদস্যপদ দিয়েছিল। সম্ভবত তিনি একটা জনপ্রিয় বোর্ড চালাতেন বলে। তাছাড়া আরেকটা কারণ হয়তো, তাদের কথাবার্তা বড়দের মত হলে কী হবে, বেশীরভাগ হ্যাকারই ছিল বয়সে তরুণ এবং তাদের সমস্যাও হত বালকসুলভ বিষয় নিয়েই। দ্য রিয়াল আর্টিকেল তাদের চেয়ে বয়সে বড় এবং জ্ঞানী হওয়ায়, তিনি জানতেন কেমন করে ওইসব সমস্যা সহমর্মিতার সঙ্গে শুনতে হয়। একজন নারী এবং অ-হ্যাকার হওয়ার সুবাদে, পুরুষসুলভ ইগোতাড়িত দ্বন্দ্বগুলোর উর্ধ্বে তিনি থাকতে পারতেন। হ্যাকিং কমুনিটিতে তাঁর একটা মাতৃমূর্তি ছিল, কিন্তু, তিনি অন্ধ মাতৃস্নেহের থেকে উর্ধ্বে থাকার মত সামর্থ্যও রাখতেন।

১৯৮৬ সালের শুরুতে দ্য রিয়াল আর্টিকেল এবং ব্লু থান্ডার মিলে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটা বিবিএস চালাতেন। তখনকার হাইস্কুল পড়ুয়া ব্লু থান্ডার, একটা বোর্ড চালানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই ভদ্রমহিলা তাকে তার সিস্টেমে কো-সিসপের সুযোগ দিয়েছিলেন। প্রথমদিকে জুটিটা ভালোই চলছিল। ব্লু থান্ডার তার হাইস্কুলের লেখাগুলোকে তার কাছে প্রুফ রিডিং এবং সংশোধনের জন্য নিয়ে আসত। কিন্তু, কিছুদিনের মাথায় সম্পর্কে তিক্ততা এসে গেল। ব্লু থান্ডারের বিবিএস চালানোর ধরণ দ্য রিয়াল আর্টিকেলের পছন্দ হচ্ছিল না। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, হ্যাকারদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে সে তাদেরই ঠকাচ্ছে। তার কৌশল ছিল: হ্যাকারদের আগে মূল্যবান তথ্য বিবিএসে জমা করতে দাও, এরপর সেগুলো চুরি করো এবং তাদেরকে আটকে রাখো। এভাবে আটকে রেখে, তাদের সব অর্জন সে কেড়ে নিত; তারপর সেগুলো তার নিজের আবিষ্কার বলে প্রচার করত। দ্য রিয়াল আর্টিকেলের মতে, এটা শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, অনৈতিকও। ব্লু থান্ডারের সঙ্গে তিনি সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিলেন এবং তাকে তার বিবিএস থেকেও বের করে দিলেন।

এর কিছুদিনের মধ্যেই, দ্য রিয়াল আর্টিকেল ভোর ৪টার দিকে নিয়মিত হয়রানিমূলক ফোনকল পেতে শুরু করলেন। অবিরাম কল আসতো। প্রতিরাতে, ঠিক ৪টার সময়। টেলিফোনের অপরপ্রান্তে কম্পিউটারে বানানো নকল গলা শোনা যেত। এরপর শুরু হল কমোডোর আসকির সস্তা ডট ম্যাট্রিক্স প্রিন্টারে প্রিন্ট করা মেশিনগানের ছবি চিঠির বাক্সে রেখে দেওয়া। সঙ্গে থাকত একটা হুমকিমূলক বার্তা, ‘যদি তোমার বাচ্চাদের জীবিত দেখতে চাও, তাহলে তাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে আনো।’

এরপর শুরু হল জানালায় ঢিল ছুঁড়ে মারা। ঢিল এসে লাগত টিভির পেছনে। এরপর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন টেলিফোন লাইন ডেড হয়ে গেছে। দেখা গেল কেউ একজন রাস্তার পাশের টেলিকম ওয়েল খুলে এক মিটার তার কেটে রাস্তায় ফেলে রেখে গেছে। অর্থাৎ, পুরো রাস্তা জুড়ে সবার টেলিফোন লাইন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

দ্য রিয়াল আর্টিকেল এইসব শিশুসুলভ দুষ্টুমি সবসময়েই পাশ কাটিয়ে চলতেন, কিন্তু এবারে একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেল। তিনি টেলিকম প্রটেক্টিভ সার্ভিসকে খবর দিলেন, যারা তার সর্বশেষ কল থেকে উত্যক্তকারীকে ধরার চেষ্টা করল। তিনি ব্লু থান্ডারকে এসবের সাথে জড়িত বলে সন্দেহ করেছিলেন, কিন্তু কিছু প্রমাণ করা গেল না। তবে, শেষ পর্যন্ত কল আসা বন্ধ হল। তাছাড়া তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডের আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন। ব্লু থান্ডারের যেটুকু সুনাম অবশিষ্ট ছিল, এরপর তাও শেষ হয়ে গেল।

যেহেতু ব্লু থান্ডারের সহযাত্রী বিবিএস ব্যবহারকারীরাই তার অবদানকে খাটো করে দেখত, সেহেতু, তার নামটাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে সেরকমই সবাই ভেবেছিল। শাস্তি হিসেবে তাকে বাকিজীবন হয়তো আন্ডারগ্রাউন্ডের বিভিন্ন রথী-মহারথী হ্যাকারদের পায়ে পায়েই ঘুরতে হবে। কিন্তু কার্ডিং শুরু হওয়ার সাথে সাথে তার ভাগ্যও যেন খুলে গেল এবং সে কার্ডিংয়ের সঙ্গে খুল্লামখুল্লা জড়িয়ে পড়লো। এতই খুল্লামখুল্লা যে, দ্রুত ধরাও খেয়ে গেল।

আন্ডারগ্রাউন্ডের লোকজন তাকে এক ধরনের আপদ বলেই মনে করত, শুধুমাত্র তার দুর্বল নৈতিকতাবোধের জন্যই নয়, তার সীমাহীন অহংকারের জন্যও। একজন শীর্ষ হ্যাকারের ভাষ্যে, ‘সে যেন ধরা খাওয়ার জন্যই এতোসব করেছিল। সে মানুষকে বলে বেড়াত যে, সে একটা ক্রেডিট ইউনিয়নের হয়ে কাজ করে এবং সেজন্যেই সে অসংখ্য ক্রেডিট কার্ড নম্বর চুরি করেছে। পয়সা কামাইয়ের ধান্ধায় সে সিস্টেমের একাউন্টের মত তথ্যও বিক্রি করত।’ শোনা যায়, একজন কার্ডারের সঙ্গে জোট বেঁধে সে নাকি পুলিশ ফ্রড স্কোয়াডে এক তোড়া ফুল পাঠিয়েছিল – এবং সেই ফুলের তোড়ার দাম দিয়েছিল চোরাই ক্রেডিট কার্ডের নম্বর ব্যবহার করে।

৩১ আগস্ট, ১৯৮৮, ব্লু থান্ডারের বিরুদ্ধে মেলবোর্ন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ২২টি অভিযোগ আনা হয়, যেগুলোর বেশীরভাগই সে পরে বাদ দিতে অথবা একটার সাথে আরেকটা সংযুক্ত করতে সমর্থ হয়। শেষপর্যন্ত, সে পাঁচটা অভিযোগ স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয় যেগুলোর মধ্যে চুরি এবং প্রতারণার অভিযোগও ছিল। দ্য রিয়াল আর্টিকেল কোর্টের এক কোণায় বসে পুরো বিচারটা দেখছিলেন।

ব্লু থান্ডার সম্ভবত তার শাস্তি নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিল, কারণ সে দুপুরের বিরতির সময় রিয়াল আর্টিকেলকে বলেছিল সে তার পক্ষে ক্যারেক্টার উইটনেস হিসেবে সাক্ষ্য দেবে কিনা। রিয়াল সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় আমাকে দিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ানো তোমার উচিত হবেনা।’ তাকে ২০০ ঘন্টার সামাজিক কাজকর্ম করার এবং ৭০৬ ডলার ক্ষতিপূরণের সাজা দেওয়া হয়েছিল।

ক্রেইগ বাওয়েন ব্লু থান্ডারের তৈরি করা আন্ডারগ্রাউন্ডের চরিত্র পছন্দ করত না। তার মতে থান্ডার এবং ট্রটস্কি হল একটা ভালো দলের মধ্যে পচা আপেল এবং তারা পুরো ব্যাপারটাকে তথ্য বিক্রির মত অপ্রীতিকর চর্চার দিকে মোড় নিতে ইন্ধন দিয়েছে। এটাই ছিল সবথেকে বড় ট্যাবু। এসব নোংরামো। এসব হল বিকার। এসব কোনো অনুসন্ধানকারীর লক্ষণ নয়, অপরাধীর লক্ষণ। এভাবেই অস্ট্রেলিয়ার আন্ডারগ্রাউন্ড তার নিষ্কলঙ্ক ভাবমূর্তি খোয়াতে শুরু করেছিল।

এসবের মাঝেই, মেলবোর্ন আন্ডারগ্রাউন্ডে এক নতুন মুখের উদয় হল। তার নাম হল স্টুয়ার্ট গিল, সে হ্যাকওয়াচ নামের একটা কোম্পানি থেকে এসেছিল।

বাওয়েন, কেভিন ফিটজেরাল্ডের মাধ্যমে স্টুয়ার্টের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। কেভিন ছিলেন একজন স্থানীয় প্রথিতযশা হ্যাকার সমালোচক, যিনি চিসম ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির কম্পিউটার এবিউজ রিসার্চ ব্যুরোর প্রতিষ্ঠাতা – যা পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ান কম্পিউটার এবিউজ রিসার্চ ব্যুরোতে পরিণত হয়েছিল। সংবাদপত্রে ফিটজেরাল্ডের বক্তব্য সম্বলিত একটা প্রতিবেদন পড়ে ক্রেইগ লোকটাকে কল করার সিদ্ধান্ত নেয়, যাকে কিনা আন্ডারগ্রাউন্ডের বেশীরভাগ সদস্যই হ্যাকার-পাকড়াওকারী বলে ধরে নিয়েছিল। আর, কল করতে সমস্যাই বা কোথায়? হ্যাকিং নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় তখনো কোনো ফেডারাল আইন ছিল না, কাজেই বাওয়েনও এসব নিয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিলনা। তাছাড়া, বাওয়েন শত্রুর সঙ্গে সাক্ষাত করতেও চেয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার আন্ডারগ্রাউন্ডের কেউ ইতোপূর্বে এমন কাজ করেন নাই, এবং বাওয়েন ভেবেছিল এখনই আসল সময়। সে ফিটজেরাল্ডের ভুল ভাঙাতে এবং তাকে হ্যাকারদের আসল উদ্দেশ্য জানাতেও চেয়েছিল। তারা বিভিন্ন সময়ে ফোনে কথা বলতে শুরু করে।

এরই এক পর্যায়ে, বাওয়েন স্টুয়ার্ট গিলের সঙ্গে পরিচিত হয়, যে ফিটজেরাল্ডের সঙ্গে কাজ করে বলে জানিয়েছিল।[1] কিছুদিনের মধ্যেই গিল পাইতে ঘুরঘুর করতে শুরু করে। ইতিমধ্যেই, বাওয়েন স্বশরীরে গিলের সঙ্গে তার মাউন্ড মার্থার বাড়িতে দেখা করে যেখানে সে তার খালা-খালুর সঙ্গে থাকত। সেখানে স্টুয়ার্টের সব ধরনের কম্পিউটারসামগ্রী ছিল, এবং গ্যারেজে কাগজপত্রের এক বিশাল সংগ্রহও ছিল।

‘ওহ, হ্যালো, পল,’ গিলের বয়স্ক খালু তাদের দুজনকে দেখামাত্র এই নামে ডাকতেন। ভদ্রলোক চলে যাওয়ামাত্র গিল বাওয়নকে চুপিচুপি টেনে নিয়ে যেত।

বলত, ‘বুড়ো এরিকের কথায় কান দিও না। যুদ্ধে হেরে তার মাথাটা গেছে। আজকে সে আমাকে পল ভাবতে শুরু করেছে, কাল হয়তো অন্যকাউকে ডাকবে।’

বাওয়েন মাথা নেড়ে বুঝাতো যে সে বুঝেছে।

স্টুয়ার্ট গিলের আরও কিছু রহস্যময় ব্যাপার ছিল, যেগুলোর যৌক্তিক ব্যাখ্যা সে দিতে চেষ্টা করত, কিন্তু, তারপরেও কোথায় যেন একটাকিছু চাপা থেকে যেত।

গিল বাওয়েনকে তার জটিল ওয়েব দুনিয়ায় নিয়ে গেল। কিছুদিনের মাঝেই সে জানালো যে, সে শুধুমাত্র হ্যাকওয়াচের হয়েই কাজ করেনা, গোয়েন্দাদের সঙ্গেও কাজ করে। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারাল পুলিশের সঙ্গে। এসিওর সঙ্গে। ন্যাশনাল ক্রাইম অথোরিটির সঙ্গে। ভিক্টোরিয়া পুলিশের ব্যুরো অফ ক্রিমিনাল ইন্টিলিজেন্সের সঙ্গে। সে বাওয়েনকে কতকগুলো গোপন কম্পিউটার ফাইল এবং কাগজপত্র দেখিয়েছিল, কিন্তু, তার আগে তাকে একটা বিশেষ ফরমে সই করতে হয়েছিল। দেখতে অনেকটা দলিলের মত। গোপনীয়তার আইনী দোহাই দিয়ে যেখানে সবকিছু গোপন রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

বাওয়েন মুগ্ধ হয়েছিল। না হয়েই বা উপায় কি? গিলের গুপ্তচরমার্কা রহস্যময় জগতটা তার মত আনাড়ি বালকদেরই কাঙ্ক্ষিত দুনিয়া। হ্যাকিঙের চেয়েও বিশাল এবং আকর্ষণীয় জায়গা। এতে তাকে দারুণ রহস্যময় দেখতে লাগবে, আর সেইখানেই তো আসল মজা।

যেমন ১৯৮৮ সালে ক্রিসমাসে একসাথে ঘুরতে যাওয়ার সময়টা। গিল বাওয়েনকে বলল, তাকে কিছুদিনের জন্য শহরের বাইরে থাকতে হবে – কিছু অবাঞ্ছিত লোকজন তার পেছনে লেগেছে। সে গাড়ি চালাতে পারত না, তাই ক্রেইগ যদি তাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করে। অবশ্যই, কোনো সমস্যা নাই। সেলে তারা একটা সস্তা মোটেলে উঠেছিল, গিল তার ভাড়া দিয়েছিল।

ক্রিসমাস কাছাকাছি চলে আসলে, স্টুয়ার্ট ক্রেইগকে বলল, সে তার জন্য দুইটা উপহার কিনেছে। ক্রেইগ প্রথম উপহারটা খুলল – একটা জন ট্রাভোল্টা ফিটনেস বই। দ্বিতীয় উপহারটা খুলতেই ক্রেইগ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। একটা লালরঙা ছেলেদের জি-স্ট্রিং। সেই সময়ে ক্রেইগের কোনো গার্লফ্রেন্ড ছিলনা – সম্ভবত স্টুয়ার্ট তাকে একটা গার্লফ্রেন্ড বাগাতেই সাহায্য করছিল।

‘ওহ, অনেক ধন্যবাদ,’ ক্রেইগ একটু অপ্রস্তুত গলায় বলল।

‘তোমার পছন্দ হয়েছে দেখে ভাল্লাগলো। যাও, পরে এসো।’ স্টুয়ার্ট বলল।

‘পরব?’ এইবার ক্রেইগের গলা আরও অপ্রস্তুত শোনাল।

‘হ্যাঁ, বন্ধু, দেখতে হবে তো তোমার গায়ে ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা। এটুকুই।’

‘ওহ, উমম, আচ্ছা।’

ক্রেইগ দোনোমনা করছিল। সে কঠিন কথা শোনাতে চাচ্ছিল না। কিন্তু, এই আবদারটা যথেষ্ট বিদঘুটে। তবে, আগে কখনো উপহার হিসেবে জি-স্ট্রিং না পাওয়ায়, এর অর্থও সে জানত না। কেউ একজন শীতের কাপড় দিলে, সেক্ষেত্রে কাপড়টা পরে দেখতে বলার অনুরোধ অস্বাভাবিক নয়।

ক্রেইগ জিনিসটা পরে দেখল। দ্রুত।

‘হ্যাঁ। মনে হচ্ছে ঠিক হয়েছে,’ স্টুয়ার্ট আলগোছে দেখে বললল।

ক্রেইগ যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দ্রুত তার আগের কাপড় পড়ে নিল।

সেই রাতে, এবং এরকম আরও ঘুরাঘুরি এবং স্টুয়ার্টের খালুর বাড়িতে রাত কাটানোর সময়, ক্রেইগ বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার এই রহস্যময় বন্ধুর ব্যাপারে অনেক ভেবেছে।

স্টুয়ার্ট নিশ্চিতভাবেই একটু বিদঘুটে, কিন্তু মনে তো হত, সে নারীদের ব্যাপারেই আগ্রহী। কাজেই ক্রেইগের ধারণা হয়েছিল স্টুয়ার্ট তাকে সেরকম নজরে দেখত না। স্টুয়ার্ট বেশ দম্ভ নিয়েই বলত যে সংবাদপত্রের এক নারী রিপোর্টারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এবং ভিডিওর দোকানে গিয়ে সে প্রায়ই ঐ মেয়ের সঙ্গে গল্প করত।

ক্রেইগ স্টুয়ার্টের উদ্ভট ব্যবহারকে বেশী আমলে নিতে চাইল না। বাচ্চাছেলেটা তার সেই বন্ধুর কাজকর্মের সঙ্গী হবার স্বার্থে তার সব খামখেয়ালীপনাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখারই পক্ষপাতী ছিল। দ্রুতই স্টুয়ার্ট ক্রেইগের কাছে পাইতে অবাধ বিচরণের সুযোগ চাইল।

ক্রেইগের জন্য এই আবদার অস্বস্তিকর হলেও, স্টুয়ার্ট ছিল নাছোড়বান্দা। ভিক্টোরিয়ার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হ্যাকিং বোর্ডে ঢুকতে না পারলে সে তার গোয়েন্দাগিরি চালাবে কীভাবে? তাছাড়া, হ্যাকওয়াচের স্টুয়ার্ট তো আসলে ক্রেইগ বাওয়েনের মত নিষ্পাপ চেহারার হ্যাকারদের পিছু নেয়নি। এমনকি, পুলিশ যখন সবাইকে ধরবে, তখন সে বাওয়েনকে বাঁচানোর চেষ্টাই করবে। স্টুয়ার্ট আসলে যাদের খোঁজ করছিল তারা হল কার্ডার – জালিয়াতের দল। আর, ক্রেইগ তো এই ধরনের মানুষদের রক্ষা করতে চায়না, তাইনা?

ক্রেইগের কাছে, স্বাভাবিকভাবেই, খটকা লাগছিল – স্টুয়ার্ট কার্ডারদের পিছু নিয়েছে, কিন্তু সে ইভান ট্রটস্কির সঙ্গেও হাত মিলিয়েছে। আর, স্টুয়ার্ট যে এসব ব্যাপার খোলাসা করবে না তা একপ্রকার নিশ্চিত – তার গোয়েন্দাগিরির দোহাই দিয়েই সে এসব বলতে চাইবেনা।

ক্রেইগ অগত্যা মেনে নিল।

বালকসুলভ সারল্যে স্টুয়ার্ট গিলকে বিশ্বাস করার কারণে ক্রেইগ যে ব্যাপারটা তখন ধরতে পারল না তা হল, আন্ডারগ্রাউন্ডের নিষ্পাপ ভাবমূর্তি এই কারণে আরও কতখানি নষ্ট হতে যাচ্ছিল। ক্রেইগ বাওয়েন যদি পরবর্তী বছরগুলির ব্যাপারে ঘুণাক্ষরেও তখন আঁচ করতে পারত – পুলিশ রেইড, ন্যায়পালের তদন্ত, সংবাদপত্রের ধারাবাহিক প্রতিবেদন এবং মামলা – তাহলে, সে সম্ভবত তখনই অতীতে ফিরে গিয়ে তার সাধের পাই এবং জেন চিরতরে বন্ধ করে দিত, নিশ্চিত

[1] অপারেশন আইসবার্গে স্টুয়ার্ট গিলের ব্যাপারে সবিস্তারে বলা হয়েছে; ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে লেজিস্লেটিভ এসেম্বলি অফ ভিক্টোরিয়া ফাঁসকৃত গোপন পুলিশী তদন্ত এবং তদসংক্রান্ত অন্যান্য কাগজপত্র প্রিন্ট করার আদেশ প্রদান করেন।