যথেষ্ট ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া। সে ভেবে বের করেছিল যে, টেপটাকে কমপক্ষে পনের মিনিট বিরতিহীন বাজাতে হবে। টেপের যে অংশে সে পজ দিয়েছে সে অংশের জন্য যদি অফিসের কোলাহল তিন সেকেণ্ডের বেশী  থেমে থাকে তাহলে তা খুব বেশী বাস্তব মনে হবে না।

কয়েকবার চেষ্টার পর টেপ করা গেল। শেকসপীয়র আওড়ে, টকাস টকাস করে কিবোর্ডে টাইপ করে আর নিজেকেই নিজে বাজখাঁই গলায় সওয়াল-জবাব করে কোনোরকমে মাঝপথে যেতেই প্রিন্টারের কাগজ গেল আটকে। ধুৎ! আবার শুরু করতে হল নতুন করে। একঘন্টা ধরে এইরকম অডিটরি সিজোফ্রেনিয়া সহ্য করে অবশেষে সে একটা নিখুঁত অফিস আবহের টেপ তৈরি করতে পারল।

এবার মেনড্যাক্স মিনার্ভা ব্যবহারকারীদের সেই আংশিক তালিকাটা হাতে নিয়ে চোখ বোলাতে শুরু করল। পুরো জিনিসটাই দেখতে কেমন যেন আত্মবিশ্বাসহীন।

‘আপনি যে নম্বরে ডায়াল করেছেন তার কোনো অস্তিত্ব নেই। দয়া করে সঠিক নম্বর জেনে আবার ডায়াল করুন।’

পরবর্তী নম্বর।

‘দুঃখীত, এই নম্বরের মালিক বর্তমানে মিটিঙে আছেন। আমি কী তাকে পরে কল করতে বলব?’ আহ, নাহ, ধন্যবাদ।

আরেকটা চেষ্টা করা হল।

‘এই ব্যক্তি আমাদের কোম্পানীতে আর কাজ করেন না। আমি কি অন্যকাউকে দিতে পারি?’ উমম, নাহ থাক।

আরেকবার।

অবশেষে, সাফল্য।

মেনড্যাক্স পার্থের একটা কোম্পানীর নম্বরে যোগাযোগ করতে পারল। সঠিক নম্বর, সঠিক কোম্পানী, সঠিক নাম। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে ভারী গলায় সে শুরু করল।

‘জন কেলার বলছিলাম, আমি সিডনির ওটিসি মিনার্ভার অপারেটর। আমাদের একটি ডি০৯০ হার্ডড্রাইভ ক্র্যাশ করেছে। একটা ব্যাকআপ টেপে আমরা ডাটা সরিয়ে নিয়েছি এবং আশা করছি আপনাদের সকল তথ্য নিরাপদেই আছে। তবে, কোনো কোনো অংশ ঘটনাক্রমে হয়তো নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। তাই আমরা আপনাদের সঙ্গে তথ্যগুলো মিলিয়ে নিতেই কল করেছি। তাছাড়া ব্যাকআপ টেপটি মাত্র দুইদিন হল নেওয়া হয়েছে, তাই নিরবিচ্ছিন্ন সেবার লক্ষ্যে আপনাদের তথ্যগুলো হালনাগাদ করা আছে কিনা তাও যাচাই করে দেখতে চাই…..’ এই বলে মেনড্যাক্স টেবিলের উপর এক তাড়া কাগজ উল্টালো।

‘ওহ, খোদা! হ্যাঁ। চলুন যাচাই করে নিই।’ চিন্তিত ম্যানেজার সায় দিলেন।

মেনড্যাক্স প্যাসিফিক আইল্যান্ডের মিনার্ভা লিস্ট থেকে সমস্ত তথ্য পড়তে লাগল, শুধুমাত্র একটা জিনিস ছাড়া। সে ফ্যাক্স নম্বরটা হালকা পরিবর্তন করে বলল। এতে কাজ হল। ম্যানেজার ভুলটা ধরে ফেললেন।

‘না না। ওইটা ভুল হয়েছে। আমাদের ফ্যাক্স নম্বরে ভুল হয়েছে।’ এই বলে তিনি সঠিক নম্বর বলতে লাগলেন।

মেনড্যাক্স বিষয়টা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়েছে এমন একটা ভাব দেখাল। সে বলল, ‘হুমম, আমাদের আশঙ্কার চেয়েও বড় সমস্যা হয়েছে মনে হচ্ছে। হুমমম’ এই বলে সে একটা রহস্যময় বিরতি দিল। এই সময়ের মধ্যে সে আসল প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করার জন্য সাহস সঞ্চয় করে নিলো।

কে যে বেশী ঘামছিল, মিনার্ভা একাউন্টে ভুল তথ্য থাকায় কোম্পানীর কর্মচারীদের কাছ থেকে অভিযোগের যন্ত্রণার কথা ভেবে পার্থের সেই ম্যানেজার নাকি প্রথমবারের মত সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং করার চেষ্টায় সেই ডেপোঁ ছোঁড়া, তা বলা মুশকিল।

গলায় নির্দেশের সুরটা যথাসম্ভব ধরে রেখে মেনড্যাক্স আবার শুরু করল, ‘আচ্ছা, তারপর। আপনাদের একাউন্ট নম্বর আমাদের কাছে আছে, কিন্তু, পাসওয়ার্ডটা আবার চেক করা দরকার…..পাসওয়ার্ডটা যেন কি?’ যেন একটা তীর ছোঁড়া হল।

লক্ষ্যবস্তুতে তা আঘাতও করল। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এল-ইউ-আর-সি-এইচ-ফুলস্টপ।’

লার্চ? ওহহ! ইনি তাহলে এডামস ফ্যামিলি কার্টুনের ভক্ত।

পার্থের ম্যানেজার চিন্তিত গলায় বললেন, ‘আপনি কী নিশ্চিত করে বলতে পারবেন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কিনা? আমরা চাইনা আমাদের সেবা বিঘ্নিত হোক।’

মেনড্যাক্স কিছুক্ষণ কিবোর্ড চাপাচাপি করল এবং তারপর ছোট্ট বিরতি দিল। চট করে নিশ্চিত করার ঢঙে বলল, ‘হ্যাঁ, সবিকছু এখন ঠিকঠাকই দেখতে পাচ্ছি।’ চমৎকার।

‘ওহ! কী বাঁচাটাই না বাঁচলাম!’ পার্থ ম্যানেজার হাঁপ ছেড়ে বললেন। গলায় আরও কৃতজ্ঞতা চড়িয়ে বললেন, ‘অনেক ধন্যবাদ, সবকিছুর জন্য। কল করার জন্য ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা নাই।’

এইবার মেনড্যাক্সের মনে হল কেটে পড়া দরকার। বিষয়টা বিব্রতকর পরিস্থিতির দিকে গড়াচ্ছিল।

‘ঠিক আছে, আমাকে এখন রাখতে হবে। অন্যান্য গ্রাহকদেরও কল করতে হবে।’ এতেই কাজ হওয়ার কথা। পূর্বানুমান অনুযায়ী, পার্থ ম্যানেজার যোগাযোগের নম্বর চাইলেন — মেনড্যাক্সও তাকে সুন্দর করে স্থায়ীভাবে এনগেজড হয়ে যাওয়া সেই নম্বরটা দিয়ে দিল।

‘আপনার সেবার জন্য আবারো ধন্যবাদ!’ আহহ, ব্যাপার নয়।

ফোন রেখে দিয়ে মেনড্যাক্স টোলমুক্ত মিনার্ভা নম্বরে কল দিল। পাসওয়ার্ডও ঠিকঠাক কাজ করল। কাজটা যে এতো সহজেই হয়ে যাবে সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিল না।

বেশীরভাগ হ্যাকার কোনো নতুন মেশিনে ঢোকার আগে যেভাবে রেকি করে, তাকেও আগে চারপাশটা সেভাবে ভালোমত রেকি করতে হল। রীতি অনুযায়ী, প্রথমেই দখল করা একাউন্টের ইলেকট্রনিক মেইল চেক করে দেখতে হয়। ইমেইলে অনেকসময় মূল্যবান তথ্য থাকে। কোনো কোনো কম্পিউটার ম্যানেজার কোম্পানীর ভিতরেই অনেকসময় অন্য একাউন্ট নাম, পাসওয়ার্ড এমনকি মডেমের ফোন নম্বরও অন্য কাউকে পাঠিয়ে থাকেন। এরপর দেখতে হবে প্রধান সিস্টেমে ঢোকার জন্য কোন কোন ডিরেক্টরি রয়েছে — এটাও তথ্যের একটা ভাল উৎস হতে পারে। সবশেষে যেতে হবে: মিনার্ভার নিউজ বুলেটিন বোর্ডে। সেখানে সিস্টেম অপারেটরদের পোস্ট করা নির্ধারিত ডাউনটাইম এবং সেবা বিষয়ক অন্যান্য বিষয় নিয়ে পোস্ট থাকে। বেশীক্ষণ সে থাকল না। প্রথমবার হালকা রেকি করার জন্যই সে ঢুকেছিল।

মিনার্ভার বহুমাত্রিক ব্যবহার ছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হল মিনার্ভা হ্যাকারদের এক্স.২৫ নেটওয়ার্কগুলোতে ঢোকার রাস্তা করে দিত। এক্স.২৫ হল একধরণের কম্পিউটার যোগাযোগ ব্যবস্থা, অনেকটা ইউনিক্স-ভিত্তিক ইন্টারনেট অথবা ভিএমএস-ভিত্তিক ডেকনেটের মত। এর কমান্ড এবং প্রটোকল ভিন্ন হলেও, তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থাটা একইরকম। এটা অবশ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। এক্স.২৫ নেটওয়ার্কগুলোতে হ্যাকারদের লক্ষ্যবস্তুগুলোও যথেষ্ট কৌতুহলোদ্দীপক। যেমন: বেশীরভাগ ব্যাংকই এক্স.২৫ এর উপর নির্ভরশীল। বস্তুত, এক্স.২৫ সারা দুনিয়ার অর্থবাজারের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত ছিল। তাছাড়া অনেক দেশই গোপন মিলিটারি কম্পিউটার সাইটগুলোকে শুধুমাত্র এক্স.২৫ এর উপর ভিত্তি করে চালাত। অনেকেই মনে করতেন এটা ইন্টারনেট বা ডেকনেট সিস্টেমের চেয়েও বেশী নিরাপদ। 

মিনার্ভা ইনকামিং কলারদের এক্স.২৫ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযোগ দিত — যে সুবিধা বেশীরভাগ অস্ট্রেলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তখন দিতে পারত না। তাছাড়া মিনার্ভা অস্ট্রেলিয়ার কলারদের লং-ডিসটেন্স টেলিফোন চার্জ ছাড়াই এটা করতে দিত।

মিনার্ভার শুরুর দিকে, ওটিসি অপারেটররা হ্যাকারদের নিয়ে খুব একটা ভাবতে চাইতেন না। কারণ সম্ভবত তারা ভাবতেন হ্যাকারদের হাত থেকে বাঁচা অসম্ভব ব্যাপার। ওটিসি ম্যানেজাররা ওটিসি এক্স.২৫ এক্সচেঞ্জ পরিচালনা করতেন। এগুলো হল এক্স.২৫ এর ডাটা নেটওয়ার্কের জন্য অনেকটা টেলিফোন এক্সচেঞ্জের মত একটা জিনিস। মিনার্ভা এবং এক্স.২৫ এর ডাটা নেটওয়ার্কে সংযুক্ত অন্যান্য সিস্টেমের ডাটা গেটওয়ে হিসেবে ব্যবহৃত হত সেইসব এক্সচেঞ্জ।

মাইকেল রোজেনবার্গের উদয় হওয়া অব্দি অস্ট্রেলিয়ার হ্যাকাররা সেগুলোতে অনায়াসে ঢুকতে পারত।

রোজেনবার্গ, এক শব্দে যিনি মাইকেলআর নামে পরিচিত, এসেই মির্নাভাকে পরিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিঙে স্নাতক, মাইকেল ২১ বছর বয়সে ওটিসিতে যোগ দিয়ে সিডনিতে চলে এসেছিলেন। সিস্টেমের যেসব হ্যাকারদের তিনি তাড়া করে বেড়াচ্ছিলেন তিনি ছিলেন তাদেরই সমবয়সী। রোজেনবার্গ ওটিসি অপারেটর ছিলেন না, তার দায়িত্ব ছিল মিনার্ভার সফটওয়্যার দেখাশোনা করা। ফোর্সের মত অসংখ্য মানুষের জীবন নরক বানিয়ে ছেড়েছিলেন এই লোক। নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক-ফোকর বন্ধ করে, হ্যাকারদের ব্যবহার করা একাউন্টগুলোকে চুপিসারে টুকে নিয়ে এবং সেগুলো বন্ধ করে, রোজেনবার্গ বলতে গেলে একা একহাতে মির্নাভা থেকে হ্যাকারদের দৌরাত্ম অনেকখানি কমিয়ে এনেছিলেন।

এসবের পরেও, হ্যাকারদের কাছে – যাদের আবার তিনি ‘আমার প্রিয় হ্যাকারেরা’ বলে সম্বোধন করতেন — নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও রোজেনবার্গের একটা ইজ্জত ছিল। ওটিসির অন্যান্যদের মত তাকে হ্যাকারেরা হেলাফেলা করত না। কারিগরি দক্ষতাই যে দুনিয়ার বিনিময়ের মাধ্যম, সেখানে রোজেনবার্গ ছিলেন তাদের সমকক্ষ এবং সেই অর্থে একজন সমৃদ্ধ লোক।

তিনি হ্যাকারদের ধরতে চাইতেন, কিন্তু তাদের কারাগারে পাঠানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। তারা যথেষ্ট বিরক্তি উৎপাদন করত বলে তিনি তার সিস্টেম থেকে তাদের ভাগাতে চাইতেন। তবে, যেকোন ধরণের সংযোগই তখন টেলিকমের মাধ্যম দিয়ে যেতে হত। আর টেলিকম আর ওটিসি দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান ছিল। তারা রোজেনবার্গকে বলেছিল, প্রাইভেসি সংক্রান্ত আইনের কারণে টেলিকমের পক্ষে এইসমস্ত ব্যাপারে কাজ করা কঠিন। তাই, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই, তাকে নিজ গরজেই হ্যাকারদের মোকাবেলা করতে হত। ওটিসি তাদের গ্রাহকের পাসওয়ার্ডের ব্যাপারে কোনো ধরণের নির্দেশনা দিত না বলে রোজেনবার্গও তার সিস্টেমকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে পারতেন না। তাদের গ্রাহকেরা ধূর্ত হ্যাকারদের হাত থেকে বাঁচার চিন্তা করার চেয়ে তাদের কর্মচারীরা যাতে সহজে পাসওয়ার্ড মনে রাখতে পারে সেইদিকে বেশী গুরুত্ব দিত। ফলাফল: অনেক মিনার্ভা একাউন্টের পাসওয়ার্ডই ছিল সহজে অনুমেয়।

১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত হ্যাকার এবং ওটিসির মধ্যে একটা অঘোষিত যুদ্ধ চলছিল এবং দুপক্ষকেই নানাভাবেই তা মোকাবেলা করতে হত।

কখনো কখনো একাউন্ট আসলে কে ব্যবহার করছে তা জানার জন্য কোনো ওটিসি অপারেটর কোনো হ্যাকারের অনলাইন সেশনের মধ্যে ঢুকে পড়তেন। কখনো কখনো অপারেটররা হ্যাকারদের অপমানজনক মেসেজ পাঠাতেন — এবং হ্যাকাররাও সেসবের উত্তর দিত। হ্যাকারদের সেশনে ঢুকে তারা বলতেন, ‘ওহ, গর্ধবের দল আবারো এসেছে।’ অপারেটটরা হ্যাকারদের তাড়াতে না পারলেও, প্রতিশোধ নেওয়ার বিভিন্ন রাস্তা ঠিকই জানতেন।

ইলেকট্রন ছিল মেলবোর্নের একজন হ্যাকার এবং অস্ট্রেলিয়ার আন্ডারগ্রাউন্ডের একজন উঠতি তারকা। সে ওটিসির এক্স.২৫ সংযোগ ব্যবহার করে জার্মানির একটা সিস্টেমে লগইন করত। অনেকটা মিনার্ভার মতোই, একটা ভিএমএস মেশিন ব্যবহার করে সে আলটস সিস্টেমে এম্পায়ার নামের একটা গেম খেলত। এই গেম হ্যাকারদের কাছে সময় কাটানোর জন্য খুবই জনপ্রিয় ছিল। ওইবারই এম্পায়ারে সে প্রথম ঢুকেছিল। একটা জটিল গেম ছিল এম্পায়ার। দুনিয়ার নানাপ্রান্তের মানুষকে তা আকর্ষণ করেছিল। সেই গেমে একদিকে নিজের উৎপাদনের ইউনিটগুলোক সচল রাখতে হত, অপরদিকে অপরের বিভিন্ন এলাকা দখল করে নিতে হত। এর এজন্য একঘন্টারও কম সময় পাওয়া যেত। মেলবোর্নের সেই হ্যাকার সেখানে একটা উচুঁ অবস্থান গড়ার উদ্দেশ্যে  সপ্তাহের পর সপ্তাহ পড়ে থাকত। সে দ্বিতীয় স্থানে ছিল।

তারপর, একদিন, সে মিনার্ভা এবং জার্মান সিস্টেম দিয়ে লগইন করল। এরপর স্ক্রিনের সামনে যা ভেসে উঠলো তা সে নিজচোখেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার দখলকৃত এলাকা, গেমে তার অবস্থান, সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে গড়া অর্জন — সবকিছু — মুছে গেছে। জনৈক ওটিসি অপারেটর ঐ হ্যাকারের লগইন নজরে রাখার জন্য একটা এক্স.২৫ প্যাকেট-স্নিফার ব্যবহার করেছিলেন। তিনি ঐ হ্যাকারের এম্পায়ার পাসওয়ার্ড জব্দ করেন। গালিগালাজ করার বদলে, অপারেটর হ্যাকারের লগঅফ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। তারপর গেমে হ্যাক করে ঢুকে হ্যাকারের সব অর্জন নষ্ট করে দেন।

এতে ইলেকট্রন রাগে ফুঁসে ওঠে। তার জীবনের প্রথম গেমেই যে অর্জন সে করেছিল তা নিয়ে সে খুবই গর্ববোধ করত। তবুও, প্রতিশোধ নিতে গিয়ে মিনার্ভা সিস্টেমের বড়সড় ক্ষতি করার কোনো প্রশ্নই আসে না। তারা তার সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে গড়া অর্জনের সবটুকু মুছে দিলেও, সিস্টেমের ক্ষতি করার কোনো ইচ্ছা ইলেকট্রনের ছিল না। বরং, সে যতটুকু ব্যবহার করতে পেরেছিল ততোটুকু পেয়েই নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেছিল।

নতুন এবং আনকোরা কাজের প্রতি ভালোবাসা থেকেই পাই এবং জেনের মত বিবিএসগুলোতে এন্টি-এস্টাবলিশমেন্টের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। এতে কোনো তিক্ততা তৈরির অবকাশ ছিল না, শুধু ছিল পুরনো খোলস ছেড়ে নতুন কিছু করার প্রত্যয়। সেই নির্দিষ্ট স্থান এবং কালটিতে যৌবনের উল্লসিত চেতনার অভ্যূদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যে পারস্পারিক আস্থার উদ্ভব ঘটেছিল, তা তাদেরকে বিরাট কোনো আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিল। তারা মডেম দিয়ে কম্পিউটারে কল করে নতুন নতুন পরীক্ষা করে দেখত। অমুক সংখ্যাগুলোর কাজটা কি? তমুক টোনটা দিয়েই বা কী করে? অমুক না করে তমুক করলে………প্রশ্ন; প্রশ্নই তাদেরকে দিনরাত জাগিয়ে রাখতো। নতুন নতুন অনুসন্ধানের ইন্ধন যোগাত। এইসব হ্যাকারদের প্রায় কেউই কোনোরকম নেশায় আসক্ত ছিলনা। এমনকি, তাদের বয়সের অনুপাতে তারা খুব বেশী পানও করতো না। কারণ, এসবকিছু তাদের জানার নেশায় ব্যাঘাত ঘটাত, তাদের ক্ষুরধার বুদ্ধিকে ভোঁতা করে দিত। আন্ডারগ্রাউন্ডের এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট দর্শন বেশীরভাগ সময়ই সেইসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হত যারা এগিয়ে যাবার প্রত্যয়ে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করত – সেটা ড্রাগই হোক, বা টেলিকমের মত প্রতিষ্ঠানগুলো।