অধ্যায় ২

দ্য কর্নার পাব

 

স্প্যান সিকিউরিটি টিমের পক্ষে নামের শানে নুযুল উদ্ধার করতে পারার কোনো কারণ ছিল না। তাই, তাদের অপারগতায় আশ্চর্য হবারও কিছু নাই। তখনকার কর্মকর্তারা ওয়ার্মের ‘অয়েলজ’ সংস্করণকে ‘অয়েল জি’ উচ্চারণ করছিলেন। তাদের অনুমান ছিল, গত সংস্করণটাকে ঠিকঠাক করার পর সেটা আরও পিচ্ছিল বা তেলতেলে হয়েছে বলেই এই নাম দেওয়া হয়েছে। এতেও অবশ্য আশ্চর্যের কিছু নাই।

কারণ, মিডনাইট অয়েলের ওই কথার মর্ম শুধুমাত্র একজন অস্ট্রেলিয়ানের পক্ষেই বোঝা সম্ভব ছিল।

পৃথিবীর ইতিহাসে রাজনৈতিক বার্তাওয়ালা প্রথম ওয়ার্ম এটি। বিশ্বব্যাপী কম্পিউটার নেটওয়ার্ক জগতের ইতিহাসেও এটা দ্বিতীয় তাৎপর্যপূর্ণ ওয়ার্ম। এই ওয়ার্ম আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতেই ফোরাম অফ ইনসিডেন্ট রেসপন্স এন্ড সিকিউরিটি টিমস বা ফার্স্ট তৈরি করার কথা চিন্তা করা হয়।[1] ফার্স্ট হল একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা জোট। এই জোট বিভিন্ন দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য আদানপ্রদানে সাহায্য করে। কিন্তু, এতো এতো অনুমানের পরেও নাসা এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি ওয়াঙ্ক ওয়ার্মের নিমার্তার অবস্থানের ব্যাপারে তখনো বলতে গেলে পুরোপুরি অন্ধকারেই ছিল । অবশ্য, গোয়েন্দারা এমন কতকগুলো আলামত খুঁজে পেয়েছিলেন যেগুলো ফ্রান্সের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। । তবে, মূলহোতা আসলে অস্ট্রেলিয়ার কোনো কম্পিউটারে ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন।

ভৌগলিকভাবে, অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীর যেকোন জায়গা থেকেই অনেক দূরের দেশ। অস্ট্রেলিয়া বলতে আমেরিকানদের চোখে মার্সাপিয়ালদেরই ছবি ভেসে ওঠে, কম্পিউটার হ্যাকারদের নয়। তাছাড়া, নাসা এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জির মত মার্কিন কম্পিউটার নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের একটা সীমাবদ্ধতার বিষয়ও ছিল। সেটা হল, তারা একটা খোলা দুনিয়ায় বাস করেন। সেখানে তারা তাদের আসল নাম, কার্ড এবং পদবী ব্যবহার করে দেখা সাক্ষাত এবং অন্যান্য কাজকর্ম করে অভ্যস্থ। অপরদিকে, কম্পিউটার আন্ডারগ্রাউন্ড হল সংখ্যার রাজ্য; আবছায়া, অন্ধকার একটা অন্তঃপুরী। এখানে মানুষ তাদের আসল নাম ব্যবহার করে না। ব্যক্তিগত বিবরণ প্রকাশের জায়গাও এটা নয়।

আসলে এটা সত্যিকার কোনো স্থানও নয়। এটা অস্থায়ী, অধরা – অজানা, পরিবর্তনশীল অলিগলির ধোঁয়াটে এক গোলকধাঁধা। কাজেই এখানে কারও পায়ের চিহ্নটিও খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

তবে, নাসা স্প্যান সিকিউরিটির ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার রন টেনকাটি তাদের কম্পিউটারগুলোতে আক্রমণের বিষয়টি বুঝতে পারার সঙ্গেসঙ্গেই এফবিআইকে ডেকেছিলেন। যথারীতি, ইউএস ফেডারাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের কম্পিউটার ক্রাইম বিভাগ তাদেরকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলেছিল। কতগুলো কম্পিউটারে আক্রমণ হয়েছে? সেগুলো কোথায়? এই আক্রমণের পিছনে কারা রয়েছে? এইসব প্রশ্ন করে আর ‘পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের সবসময় জানাবেন’ বলেই তারা চলে গেল। এনার্জি ডিপার্টমেন্টের সিআইএসি টিমের মতো, সম্ভবত এফবিআইয়েরও ভিএমএস সম্পর্কে তেমন কোনো জানাশোনা ছিল না।

তবে ওয়ার্ম আক্রমণ যে অত্যন্ত বিপদজনক ব্যাপার এটুকু বোঝার মত বোধশক্তি এফবিআইয়ের ছিল। আসলে গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করতেই ইলেকট্রনিক আলামতগুলো বিদেশী কম্পিউটার সিস্টেমে রয়েছে এমন একটা  ভুয়া নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছিল। এফবিআইয়ের পরে ইউএস সিক্রেট সার্ভিসও বিষয়টির সঙ্গে কিছুটা জড়িয়ে পড়ে। এরপর এই হাঙ্গামায় যোগ দেয় ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থা, দ্য ডিরেকশন ডি লা সার্ভেইলান্স দ্যু টেরিটোরি বা ডিএসটি।

ডিএসটি এবং এফবিআই যৌথভাবে ঘটনার তদন্ত করতে শুরু করে। চোর পালালে যেমন বুদ্ধি বাড়ে, তেমনি এই সমস্ত ঘটনা ঘটে যাবার পরে সরকারি সংস্থাগুলো নানা ধরণের সম্ভাবনা হাতড়ে হাতড়ে মরছিল। এফবিআই চাইছিল হোতাদের স্বশরীরে পাকড়াও করবে। আর ডিএসটি চাইছিল আক্রমণের সূত্রপাত যে ফ্রান্স থেকে হয়নি সেই ব্যাপারটি পরিষ্কার করতে।

ফলে, গুপ্তচরবৃত্তির চিরায়ত ঐতিহ্য মেনে এফবিআই এবং ডিএসটি উভয়েই দুইটা কমুনিকেশন চ্যানেল তৈরি করল – একটা অফিসিয়াল চ্যানেল আরেকটা হল গোপন চ্যানেল। অফিসিয়াল চ্যানেলে দূতাবাস, এ্যাটাচি, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ইত্যাদি বাগাড়ম্বর তো ছিলই, আর ছিল চিরায়ত ঐতিহ্য মেনে সহজ প্রশ্নের উত্তরেঅন্তহীন বিলম্বের রেওয়াজ।। আর গোপন চ্যানেলে ছিল ফোনকলের মাধ্যমে টপাটপ উত্তর পাবার ব্যবস্থা।

ফ্রান্স ছিল পুরো ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বড় স্প্যান ব্যবহারকারী দেশ। সেখানকার স্প্যান নেটওয়ার্কে ক্রিস নামে রন টেনকাটির পরিচিত একজন সহকর্মী ছিলেন। কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ছাড়াও ক্রিস আরও কিছু ব্যাপারের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ফরাসি সরকারের সঙ্গে তার বিশেষ যোগাযোগ ছিল এবং সম্ভবত সরকারি কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সঙ্গেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। তদন্তের জন্য এফবিআইয়ের যখন গোপন কারিগরি তথ্য দরকার পড়ল, তখন তাদের একজন গোয়েন্দা রন টেনকাটির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। রন এবং ক্রিসকে বানানো হল গোপন যোগাযোগের এজেন্ট। যেকোন তথ্যই দূতাবাসের আমলাদের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা মেনে পরিবেশন করাই নিয়ম। কিন্তু, রনের সঙ্গে চুক্তি হল, এফবিআই যখন যখন তাকে বলবে, ‘রন, তোমার বন্ধুকে অমুক জিনিসটা জিজ্ঞেস কর তো,’ রন তখন সেই হুকুম তামিল করবেন।

টেনকাটি তখন ক্রিসকে বলবেন, ‘ক্রিস, এফবিআই অমুক জিনিসটা জানতে চায়।’ তখন ক্রিস দরকারি তথ্য সংগ্রহ করবেন। তারপর তিনি টেনকাটিকে ফোন করে বলবেন, ‘রন, তোমাদের প্রশ্নের এই হল উত্তর। এখন, ডিএসটি অমুক জিনিসটা জানতে চায়’। এবং, রনও ডিএসটির জন্য তথ্য খুঁজে দিবেন।

এভাবেই গোপন রাস্তায় তদন্ত কার্যক্রম চলছিল। মার্কিনীদের তদন্তের ভাবভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছিল নাসায় আক্রমণ ফরাসি কম্পিউটার থেকেই হয়েছে – এই উপসংহারে পৌঁছানোই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তবে, আসলে ওয়ার্মটা অন্য একটা সিস্টেম থেকে এসেছিল। কিন্তু, পুরো ঘটনাটাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় ফরাসি কোনো কম্পিউটার থেকেই এসবের সূচনা হয়েছে।

এইরকম ভাবভঙ্গী ফরাসিদের পছন্দ হল না। একটুও না। ফ্রান্স থেকে ওয়ার্মটার ছড়িয়ে পড়ার প্রশ্নই আসে না। এ ডাহা মিথ্যা অপবাদ।

জবাবে ফরাসিরা জানাল যে, তারা নিশ্চিত আমেরিকা থেকেই ওয়ার্মটা ছড়িয়েছে। তা নাহলে সেটাকে কেন এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হল যাতে ওয়ার্মটা দখলে নেওয়া কম্পিউটারগুলোর বিস্তারিত তথ্য জেমপ্যাক নামের একটা আমেরিকান মেশিনের ঠিকানায় মেইল করে দেয়? ওয়ার্মের নির্মাতা একজন আমেরিকান বলেই সে এভাবে প্রোগ্রাম করেছে। সুতরাং, ফরাসিরা আমেরিকানদের সাফ জানিয়ে দিল – সমস্যা আমাদের নয়, বরং, সমস্যা তোমাদের।

হ্যাকারদের একটা সাধারণ কৌশল হল হ্যাকার এবং শিকারের মধ্যে এমন ধরণের ভুয়া পরিচয় তৈরি করা যেটা চট করে ধরে ফেলা যায়। একথা কম্পিউটার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞমাত্রেই জানেন। এইরকম কৌশল অবলম্বন করলে এফবিআইয়ের মত সংস্থাগুলোর পক্ষে আসল লোককে খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে যায়। কাজেই, হ্যাকারের ফেলে যাওয়া আলামতের উপর ভরসা করে তার সত্যিকার জাতীয়তার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। আর,এসব আলামত নিয়েই যে গোয়ান্দারা মেতে থাকবে এই ব্যাপারে দুষ্কৃতিকারীরা ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল ছিল।

মূলত, কয়েকটা কম্পিউটার লগের উপর ভিত্তি করে টেনকাটি ফরাসি সম্পৃক্ততার তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন। এই লগগুলো থেকে জানা যায়, ১৬ অক্টোবর, মঙ্গলবার অনেক সকালে নাসা আক্রান্ত হয়। উল্লেখ্য, লগগুলোতে আপাতদৃষ্টিতে কোনো গোলমাল নজরে না পড়ায় তখন যথেষ্ট গুরুত্বও দেওয়া হয়নি। যাহোক, ওয়ার্মটা ওইদিনই নিজের প্রতিলিপি উৎপাদন করতে শুরু করে। এই প্রতিলিপিগুলো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে আরও বেশীসংখ্যক কম্পিউটারে আক্রমণ চালাতে শুরু করে। এই আক্রমণ কখন শুরু হয়েছিল আর কখনই বা শেষ হয়েছিল,  সেইতথ্য সকাল ১১টার মধ্যে জানতে পারা একটা অসম্ভব ব্যাপার।

অথচ, প্রথম আক্রমণের কিছু সময় পরে, ডিএসটি সূত্র জানায় কয়েকজন গোয়েন্দা কিছু ব্যাপারে কথা বলতে ওয়াশিংটন ডিসিতে যাচ্ছেন। তারা বিষয়গুলো নিয়ে এফবিআইয়ের সঙ্গে বসতে চান। নাসা ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয় এবং নাসা স্প্যান সিকিউরিটির একজন করে কর্মকর্তাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।

টেনকাটি এক প্রকার নিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি প্রমাণ করতে পারবেন ওয়াঙ্ক ওয়ার্মের সূত্রপাত ফ্রান্স থেকেই হয়েছিল। কিন্তু তিনি এও জানতেন, তাকে সবকিছু কাগজে-কলমে দেখাতে হবে, যাতে এফবিআইয়ের সঙ্গে আলোচনার সময় ফরাসি গোয়েন্দাদের যাবতীয় প্রশ্ন এবং পাল্টা-যুক্তির সঠিক জবাব দেওয়া যায়। পুরো আক্রমণের সময়রেখা তৈরি করার সময় টেনকাটি গড়বড়টা লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি দেখেন জেমপ্যাক একটা এক্স.২৫ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। আর, একটা ফরাসি কম্পিউটার সিস্টেম ওয়ার্ম আক্রমণের সময় সেটা ব্যবহার করে জেমপ্যাকের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে।

সেই সূত্র ধরে এগিয়ে তিনি ওই ফরাসি সিস্টেমের ম্যানেজারকে খুঁজে বের করেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তিনি কী টেনকাটিকে সাহায্য করেছিলেন? আজ্ঞে, হ্যাঁ। তিনি কিন্তু বলেছিলেন, মেশিন আপনার করকমলে তুলিয়া দিলাম, টেনকাটি মহাশয়।

টেনকাটির এক্স.২৫ নেটওয়ার্ক ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ছিল না; অন্যান্য কমুনিকেশন নেটওয়ার্কগুলোর তুলনায় এতে ভিন্ন ধরণের কমান্ড ব্যবহার করা হত। এদিকে, ওয়ার্মের গতিবিধিও অনুসন্ধান করা দরকার ছিল। তাই, তার একজন সাহায্যকারী দরকার হয়েছিল। তিনি তার বন্ধু বব লায়ন্সকে ডেকে সাহায্য চেয়েছিলেন।

খোঁজাখুঁজির পরে টেনকাটি যা পেলেন তা দেখে নিজেই চমকে গিয়েছিলেন। ফরাসি মেশিনটায় ওয়ার্মের অস্তিত্ব ছিল সত্য। এমনকি অন্যান্য মেশিনগুলোয় যে ধরণের লগইন ফেইলর পাওয়া গেছে সেসবের সঙ্গে এটারও লগইন ফেইলর মিলে যায়। কিন্তু, এখানকার লগগুলোর অবশিষ্টাংশ ১৬ অক্টোবরের নয়। এগুলো নাসায় আক্রমণেরও দুই সপ্তাহ আগেকার অবশিষ্টাংশ। তারমানে হল, এই কম্পিউটারটাকে ওয়ার্মটা একটা অন্তবর্তীকালীন মেশিন হিসেবে ব্যবহার করেছিল। অর্থাৎ, এটা ছিল একটা আঁতুরঘর।

বা বলা যেতে পারে, কেন্দ্রস্থল।

টেনকাটি সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়েই এফবিআই অফিসে ডিএসটির গোয়েন্দাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। ফরাসিরা কোন অভিযোগগুলোকে সামনে তুলবে ধরতে পারে সে সম্পর্কে তার আন্দাজ ছিল।  নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার পর, ফরাসি গোয়েন্দারা তা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করতে পারল না। কিন্তু তারাও একটা বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করল। আজ্ঞে হ্যাঁ, বিস্ফোরক তথ্য। তারা বললেন, আপনি হয়তো ফরাসি সিস্টেমকে কেন্দ্রস্থল হিসেবে ব্যবহার করার আলামত খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু, আমাদের তদন্তে অন্য একটা দেশের নাম ওই এক্স.২৫ সংযোগের উৎস হিসেবে উঠে এসেছে। তাদের সক্রিয়তাও ওয়াঙ্ক ওয়ার্মের প্রস্তুতির সময়ের সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে।

জায়গাটা হল অস্ট্রেলিয়া।

কোনো ফরাসি হ্যাকার যে ওয়াঙ্ক ওয়ার্মের সঙ্গে জড়িত নয়, সে ব্যাপার ফরাসি গোয়েন্দারা নিশ্চিত হলেন। সমস্যাটা অন্তত আমাদের নয় – এই ভেবে তারা স্বস্তিবোধ করলেন।

এসবের পর বিষয়টাকে আরও খতিয়ে দেখার মত যথেষ্ট আলামত আর পাওয়া গেল না। কারা এসবের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে সেই বিষয়ে মার্কিন এবং অস্ট্রেলিয়ান আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী আর কম্পিউটার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল একেবারেই ঝাপসা। কাজেই, অনেকের দিকে আঙ্গুল তোলা হলেও কাউকে ধরা সম্ভব হল না। কারণ, শেষপর্যন্ত শুধু কিছু কাকতালীয় ঘটনা আর অস্পষ্ট কিছু আলামত ছাড়া কিছুই পাওয়া গেল না। সেগুলো মামলা ঠোকার জন্যও পর্যাপ্ত নয়। আর দশটা অস্ট্রেলিয়ান হ্যাকারের মতোই, ওয়াঙ্কের নির্মাতাও কম্পিউটার আন্ডারগ্রাউন্ডের অন্ধকার জগতে ছায়ামূর্তির বেশেই উদিত হয়েছিলেন। কিছুক্ষণের জন্য সক্রিয় হয়েই আবার যেন অন্ধকারেই মিলিয়ে গেলেন।

১৯৮০’র বাস্তবতায় অস্ট্রেলিয়ার কম্পিউটার আন্ডারগ্রাউন্ডে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলেই বোধহয় ওয়াঙ্কের নির্মাতাও গোকূলে বাড়তে পেরেছিলেন।

এপল টু এবং কমোডর ৬৪ এর মত সহজলভ্য ব্যক্তিগত কম্পিউটার সাধারণ, আধা-শহুরে পরিবারগুলোতে জায়গা করে নিয়েছিল। এই কম্পিউটারগুলো ব্যাপকভাবে সমাদৃত না হলেও, অন্তত সস্তা দামে পাওয়া যেত। যে কারণে কম্পিউটারপ্রেমীরা এগুলো সহজেই কিনতে পারতেন।

১৯৮৮ সালে, নাসায় ওয়াঙ্ক ওয়ার্ম আক্রমণের এক বছর আগে, অস্ট্রেলিয়ায় যেন উন্নয়নের জোয়ার বইছিল। দেশটা তখন দুইশ বছর পূর্তির আমেজে মেতে ছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছিল হুড়হুড় করে। বাণিজ্যনীতি এবং পুরোনো আইনকানুন শিথিল করা হচ্ছিল। ক্রোকোডাইল ডান্ডির মত চলচ্চিত্র বিশ্ব চলচ্চিত্রে আসন করে নিয়েছিল এবং লস এঞ্জেলস আর নিউ ইয়র্কের মত শহরে অস্ট্রেলিয়ানরা সেই সুবাদে ফ্লেভার অফ দ্য মান্থ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। । একটা আশা জাগানিয়া পরিস্থিতি ছিল সবখানে। জনগণ বুঝতে পারছিল যে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, প্রায় সতের মিলিয়নেরও বেশী মানুষের শান্তিপূর্ণ একটা দেশ। এশিয়ার কোল ঘেঁষে অবস্থিত হলেও দেশটা পশ্চিম ইউরোপীয় গণতন্ত্রের ধারায় চলে। তাদের পরিবর্তন সম্পর্কে আরেকভাবে বলা যায়, প্রথমবারের মত অস্ট্রেলিয়ানরা সাংস্কৃতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। আমেরিকার মত ‘সব সম্ভবের সংস্কৃতির’ বিপরীতে দেখলে, আত্মপরিচয়ের অদ্ভুত এক সংকট বরাবর ছিল সেখানে। তবে, নতুন জিনিসের অনুসন্ধান এবং গবেষণার জন্য সবার প্রথমে চাই আত্মবিশ্বাস। ১৯৮৮ সালের অস্ট্রেলিয়া শেষ পর্যন্ত সেই অত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিল।

তবে তাদের নতুন অর্জিত আত্মবিশ্বাস এবং ইতিবাচক পরিস্থিতি বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার চিরায়ত অস্ট্রেলীয় রীতিকে দমন করতে পারেনি। তবুও দুটি ধারাই একসাথে কেমন করে রয়ে গিয়েছিল তা এক রহস্য। গুরুগম্ভীর এবং পবিত্র মার্কা জিনিসপত্রকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা অস্ট্রেলীয় রসবোধের আদি বৈশিষ্ট্য। আর রুই-কাতলাগোছের প্রতিষ্ঠানগুলোকে গভীর অভক্তি নিয়ে মজা-মশকরা করা দেখে তখন বাইরের অনেক লোকই অবাক হত। সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি এই গণ-সংশয়ের কারণেই বোধহয় অস্ট্রেলিয়ার কম্পিউটার আন্ডারগ্রাউন্ড ওই দূরন্ত নয়া জামানার নয়া উত্তেজনা আর আশাবাদের ডামাডোলে বিচলিত না হয়েই  ন্যূনতম হলেও বিকশিত হতে পেরেছিল।

১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার কম্পিউটার আন্ডারগ্রাউন্ড দুনিয়া এশিয়ার স্ট্রিট-বাজারগুলোর মত জমজমাট ছিল। সেইসময় অদৃশ্য জায়গার পাশাপাশি দৃশ্যমান জগতেও এর অস্তিত্ব ছিল। সেইখানে ক্রেতারা বিভিন্ন স্টলে ঘুরে বেড়াত, বিক্রেতাদের সঙ্গে দর কষাকষি করত, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত এবং দলবেঁধে ভীড়ের মধ্যে হেঁটে বেড়াত। ওই মার্কেটে বেচাকেনার চেয়ে লোকজনের মেলামেশাই হত বেশী। চাইনিজ সিল্কের রিমের মত নতুন নতুন জিনিসপত্র টেবিলে ছড়িয়ে থাকত, কথা বলতে বলতেই সেসব বিকিকিনিও হত। আর, অন্যান্য স্ট্রিট মার্কেটের মতো সেখানেও ভালো ভালো জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখা হত। শুধুমাত্র বিক্রেতার সবথেকে খাতিরের লোক সেগুলো কেনার সুযোগ পেত। মজার কথা হল, আন্ডারগ্রাউন্ডে কোনো টাকা পয়সা বিনিময়ের ব্যবস্থা ছিল না; বিনিময়ের একক ছিল তথ্য। অর্থোপার্জনের জন্য মানুষ সেখানে জড়ো হত না, সমীহ অর্জন আর নতুন জিনিস খুঁজতেই তারা আসত।

অস্ট্রেলিয়ার কম্পিউটার আন্ডারগ্রাউন্ডের সদস্যরা বিবিএস নামের বুলেটিন বোর্ড সিস্টেম ব্যবহার করে যোগাযোগ করত। এই যুগের তুলনায় সেটা বেশ সহজ একটা জিনিস। বিশেষভাবে সাজানো একটা অ্যাপল টু কম্পিউটার, একটা মডেম এবং একটা লোন টেলিফোন সংযোগের সমন্বয়ে বিবিএসগুলো তৈরি করা হত। আর, সেখানে সব শ্রেণীর মানুষের সমাগম ঘটত। কর্মজীবি শ্রেণীর টিনেজার থেকে শুরু করে, প্রাইভেট স্কুলের ছাত্র এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারাও সেখানে আসত। ছিল চাকরী হাতড়ে বেড়ানো বিশোর্ধ যুবকেরা, এমনকি কখনো কখনো সপ্তাহান্তে কম্পিউটার নির্দেশিকা পড়ে কাটানো আর ঘরে বসে হাতুড়ে কম্পিউটার-বানিয়ে ত্রিশ-চল্লিশোর্ধ পেশাজীবি লোকেরাও এসে জুটতেন। বেশীরভাগ বিবিএস ব্যবহারকারীই ছিলেন পুরুষ। কখনো কখনো তাদের বোনেরাও হয়তো হাতড়ে হাতড়ে বিবিএসের দুনিয়ায় চলে আসত। তবে তাদের বেশীরভাগই আসত প্রেমিক জোটাতে। কার্যসিদ্ধি হলেই তারা হাওয়া হয়ে যেত, ডুব মারত সপ্তাহ বা মাস বা হয়তো আবার ফিরে আসার প্রয়োজন না হওয়া পর্যন্ত।

বিবিএস ব্যবহারকারীদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। তারা প্রায় সকলেই সাধারণ বৃদ্ধিমত্তার চেয়ে একটু বেশীই বুদ্ধিমান — সাধারণত, দারুণ কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন — এবং তারা তাদের এই শখ নিয়ে সারাক্ষণ মেতে থাকে। অবশ্য মেতে না থেকে উপায় কী! কারণ, বিবিএসগুলোর সদাব্যস্ত লোন ফোনে ডায়াল করতেই পাক্কা ৪৫ মিনিট ধরে চেষ্টা করতে হত। আর শুধুমাত্র কম্পিউটার সিস্টেমে ঘুরে আসতে কমসেকম আধাঘন্টা লেগে যেত। তাই, বেশীরভাগ অতিউৎসাহী বিবিএস-পাগলই প্রতিদিন রুটিন মেনে একাধিকবার বসতেন।

নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে, বিবিএস হল সাধারণ বুলেটিন বোর্ডের ইলেকট্রনিক সংস্করণ। যেমন করে আমাদের স্কুল শিক্ষকরা কর্কবোর্ডের উপরে রঙচঙে ফিতা দিয়ে সেটাকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে দিতেন, সেভাবে বিবিএসের মালিকও তার বিবিএসকে বিভিন্ন সেকশনে ভাগ করে দিতেন। একটা বিবিএসে ৩০ বা ততোধিক ইলেকট্রনিক ডিসকাশন গ্রুপ থাকত।

বোর্ডের একজন ব্যবহারকারী হয়ে আপনি হয়তো রাজনীতি বিষয়ক অংশটি বেছে নিলেন। সেখানে আপনি চাইলে এএলপি বা লিবারাল পলিসির মত বিষয় নিয়ে আপনার মতামত জানিয়ে ‘নোট’ও লিখে রাখতে পারবেন। সেসব লেখা সেই সেকশনের সকলেই পড়তে পারবে। অথবা, আপনি যদি নিজের কাব্যপ্রতিভার ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনার নিজের লেখা পোয়েটস কর্নারে প্রকাশ করার সাহসও দেখিয়ে দিতে পারেন। অবশ্য ওইসব জায়গা বেশীরভাগ সময়ই অন্ধকার নিয়ে ভাবালুতার জগত আর মানুষের প্রতি ঘৃনাভরা লেখা দিয়ে ভরা থাকত। কৈশোরের নানান দুঃখ-কষ্ট থেকে প্রভাবিত হয়েই মানুষ এসব লিখত। তারচেয়ে, ওসব রেখে আপনি বরং সংগীত বিষয়ক আলোচনায় ঢুকলেন। বিবিএসগুলোতে, আক্ষরিক অর্থেই, সব ধরণের গান নিয়ে আলোচনা হত। জনপ্রিয় গ্রুপগুলোর মধ্যে ছিল পিংক ফ্লয়েড, ট্যানজারিন ড্রিম এবং মিডনাইট অয়েল’র মত ব্যান্ড নিয়ে আলোচনা। মিডনাইট অয়েলের এন্টি-এস্টাবলিশমেন্টমূলক কথাবার্তা তখন বিবিএসের নতুন কমুনিটির মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল।

ঊনিশশ’ অষ্টআশি সাল ছিল অস্ট্রেলিয়া জুড়ে বিবিএস সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ। সেটা ছিল নিষ্কলুষ একটা সময় এবং তাতে ছিল গোষ্ঠী চেতনারপ্রাধান্য। সেটা ছিল হাটবাজারের মতোই একটা মুক্তাঞ্চল, যেখানে ছিল অফুরন্ত জীবনীশক্তি আর চিন্তা-ভাবনা বিনিময়ের সুযোগ। তখনকার বেশীরভাগ মানুষই তাদের গন্ডীর চেনাজানা লোক এবং বিবিএস অপারেটরদের উপর দারুণ আস্থা রাখত, তাদের অনেক সময় প্রায় ঈশ্বরের মত ভক্তিও করত। সর্বোপরি, জায়গাটা ছিল আনন্দে ভরপুর। এবং, এককথায়, অত্যন্ত নিরাপদ। এই একটা কারণেই সম্ভবত সেখানকার বাসিন্দারা নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে নিশ্চিন্ত বোধ করতেন। আর, এইরকম একটা জায়গাতেই ওয়াঙ্ক ওয়ার্মের নির্মাতা তার কম্পিউটার দক্ষতা ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

অস্ট্রেলিয়ার নতুন, প্রাণোচ্ছ্বল এই ইলেকট্রনিক সভ্যতার রাজধানী ছিল মেলবোর্ন। দক্ষিণাঞ্চলের এই শহরটাই কেন বিবিএস এবং তার গোপন কম্পিউটার আন্ডারগ্রাউন্ড দুনিয়ার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল সেকথা বলা মুশকিল। হয়তো শহরটা ঐতিহাসিকভাবেই অস্ট্রেলিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চার প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় এমন অনেক তরুণদের আঁতুরঘরে পরিণত হয়েছিল। তারা স্রেফ আগ্রহের চেয়েও বেশীকিছু দিয়ে তাদের সিস্টেমটা তৈরি করেছিল এবং কম্পিউটারের প্রতিটা বিটকে তারা হৃদয় দিয়ে অনুভব করত, যা সাধারণের নজরে পড়ার কথা নয়। হয়তো মেলবোর্নের আধা-শহুরে জীবনযাত্রা আর  তার সৌখিন চিন্তাধারার লোকেরা  এমন এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের জন্ম দিয়েছিলের যা বিবিএসের বিকাশের জন্য অনুকূল ছিল। অথবা, কে জানে মেলবোর্নের বিষন্ন সমুদ্রসৈকত আর বৈরী আবহাওয়ার কারণেই এসব হয়েছিল কিনা। যেমনটা মেলবোর্নের একজন হ্যাকার বলেছিলেন, ‘শীতেরদিনে কম্পিউার আর মডেম নিয়ে শীতনিন্দ্রায় পড়ে থাকা ছাড়া এখানে আর কীই বা করার থাকে?’

১৯৮৮ সালে, মেলবোর্নে ৬০-১০০ জন বিবিএস অপারেটর ছিলেন। এই সংখ্যাটা আন্দাজে বলতে হল কারণ, গতিশীল কোনো জিনিসকে হিসাব করা কঠিন ব্যাপার। অনেকের গ্যারেজে আনাড়ি কায়দায়, জটলা পাকানো তারের স্তুপের সঙ্গে সেকেন্ডহ্যান্ড ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র এমনভাবে জুড়ে দেওয়া থাকত, যে দেখে মনে হত যেন এসবের আয়ু টিনেজারদের অস্থির মতির মতোই ক্ষণস্থায়ী। তাই, নতুন নতুন বিবিএস তৈরি হত, দুয়েক সপ্তাহ চলত এবং তারপর আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যেত।

কেউ কেউ দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে চালাতেন, হয়তো রাত ১০টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। হয়তো যখন ঘুমাতে যেতেন তখন তিনি হয়তো বাড়ির ফোন লাইনটা খুলে বিবিএসে লাগিয়ে দিতেন এবং সকাল পর্যন্ত সেভাবেই চলত। অন্যরা ২৪ ঘন্টাই চালাতেন, তবে, রাতেই লাইনগুলো সবথেকে বেশী ব্যস্ত থাকত।

অবশ্য সবাই শুধুমাত্র বুদ্ধির চর্চার পেছনেই লেগে থাকত, তা নয়। অনেকেই চিন্তা-ভাবনার পাশাপাশি প্রতিপত্তির পেছনেও ছুটত। ইলেকট্রনিক বুলেটিন বোর্ডে এক ধরণের ব্যক্তিত্ব নির্মাণ করা সম্ভব ছিল, সেটাকে পছন্দমত গড়ে নিজের মত গুছিয়েও নেওয়া যেত। বয়স এবং চেহারা সেখানে কোনো বিষয় ছিল না। কারিগরি দক্ষতাই আসল কথা। যেকোন খেয়ালী, লাজুক টিনেজ বাচ্চাও সেখানে রাতারাতি ভদ্র, সৌম্য বিবিএস চরিত্র বনে যেতে পারতেন। রূপান্তরের শুরুটা হত নাম নির্বাচনের মধ্যদিয়ে। বাস্তবে, আপনি হয়তো আপনার মায়ের পছন্দে কোনো মৃত চাচার সম্মানে রাখা এলিয়ট ডিঙ্গল মার্কা নাম নিয়ে ফেঁসে গেছেন। কিন্তু, বিবিএসে আপনি হতে পারেন ব্লেড রানার, নেড কেলি অথবা ম্যাড ম্যাক্স। মজার কথা হল, এইরকম নাম পছন্দ করেই টিনেজ ছেলেমেয়েরা বিবিএসে ঘুরে বেড়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত।

সাধারণত, কোনো ব্যবহারকারী কোনো হ্যান্ডেল অর্থাৎ, অন-লাইন নাম পছন্দ করে ফেললে, তার ঐ নামটাই স্থায়ী হয়ে যেত। তার সব ইলেকট্রনিক মেইল ওই নামধারী একাউন্টে এসে জমা হত। বুলেটিন বোর্ডের লেখাগুলোতেও ঐ নাম ব্যবহার করেই ঢুকতে হত। অন্যরাও তাকে ওই নামেই চিনত। প্রতিটা হ্যান্ডেলেই নিহিত থাকত কোনো না কোনো গূঢ়ার্থ। ঐ অর্থের নিরীখেই হ্যান্ডেলগুলো সাধারণ নামে রূপান্তরিত হত। অবশ্য যে ধরণের ব্যক্তিত্ব ওইসব নামের মধ্যদিয়ে প্রকাশ পেত তা হয়তো ঐ ব্যক্তির অল্টার ইগো। এই কারণেই দ্য উইজার্ড, কোনান এবং আইসম্যান নামধারীরা এসে ক্রিস্টাল প্যালেস, মেগাওয়ার্কস, দ্য রিয়াল কানেকশন এবং ইলেকট্রিক ড্রিমস এইসব বিবিএসে সময় কাটাত।

এই ধরণের ব্যবহারকারীরা বিবিএসে বিচিত্র জিনিসপত্রের কদর করত। কেউ কেউ শুধুমাত্র তাদের পরিমণ্ডলের মধ্যেই সামাজিক মেলামেশা করতে বেশী পছন্দ করত। এরা ছিল বুদ্ধিমান কিন্তু অসামাজিক, এবং এরা, কম্পিউটারের বিভিন্ন কারিগরি বিষয় নিয়ে আগ্রহী এমন সমমনা মানুষদের সাথে মিশতে পছন্দ করত। অথচ, এদের অনেকেই বাস্তবে নির্বাসিতের মত জীবনযাপন করত। কেউ কেউ হয়তো স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়েও কখনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে ‘স্বাভাবিক’ হতে পারেনি। তাদের কেউ কেউ হয়তো প্রথম প্রথম চাকরীজীবন শুরু করলেও, টিনেজের অকিঞ্চিতকর কাজকর্মের অভ্যাস দ্রুত ত্যাগ করে উঠতে পারেনি। মোটের উপর বলা চলে, তাদেরকে কেউ ফুটবল দেখতে আর পানশালায় নিয়ে যেতে চাইবে না।

আর, না নিয়ে গেলেই বা কী।  সাধারণত, তারা ফুটবলেও বিশেষ আকর্ষণ বোধ করে না।

প্রতিটা বিবিএসেরই স্বকীয় বৈশষ্ট্য ছিল। কিছু কিছু ছিল বৈধ জিনিসপত্রে ভরা, তাদের সবকিছুই বৈধ হওয়ায় সবই ছিল উন্মুক্ত। অন্যদের মধ্যে দ্য রিয়াল কানেকশন, একসময় অস্ট্রেলিয়ার প্রথম যুগের হ্যাকারদের জায়গা করে দিয়েছিল, কিন্তু পরে তারা সিঁধা হয়ে গিয়েছিল। ১৯৮৯ সালের জুনে কমনওয়েলথ সরকার প্রথম হ্যাকিং আইন প্রণয়ন করলে তারা তাদের বোর্ড থেকে হ্যাকিঙের সেকশন বন্ধ করে দেয়। সেই সময়ে মেলবোর্নের বিবিএসদের মধ্যে হাতেগোনা দশ থেকে বারোটিতে গোপন কম্পিউটার আন্ডারগ্রাউন্ড ছিল। এগুলোর বেশীরভাগই ছিল শুধুমাত্র নিমন্ত্রিত ব্যবহারকারীদের বোর্ড, যেমন: গ্রে হক এবং দ্য রেল্ম। এখানে কেউ চাইলেই সংযুক্ত হয়ে নতুন একাউন্ট খুলতে পারত না। এজন্য বোর্ডের মালিকের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পেতে হত। সাধারণ ব্যবহারকারীদের এতে আবেদন করার সুযোগ ছিল না।

১৯৮৭ এবং ১৯৮৯ এর দিকের অস্ট্রেলিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্ডারগ্রাউন্ড চক্রের নাম ছিল প্যাসিফিক আইল্যান্ড এবং জেন। ২৩ বছর বয়সী ক্রেইগ বাওয়েন নামের এক যুবক এই দুটি সিস্টেম তার ঘরে বসে চালাত।

থান্ডারবার্ড১ নামে পরিচিত বাওয়েন, ১৯৮৭ সালে প্যাসিফিক আইল্যান্ড চালু করে। সে হ্যাকারদের জন্য একটা জায়গা তৈরি করতে চেয়েছিল। মেলবোর্নের প্রথমদিককার হ্যাকিং বোর্ড ‘এহাবস’ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গেলে উদীয়মান হ্যাকিং গোষ্ঠীটিও বিলুপ্তির দিকে এগোতে থাকে। তখন বাওয়েন তাদের জন্য একটা ঘর তৈরির কথা চিন্তা করেছিল। বিবিএস বাজারের ভীড়ের মধ্যেই ঘরটা হবে কিছুটা অন্ধকার, মাতৃগর্ভের মত একটা ক্যাফে বার যেখানে মেলবোর্নের হ্যাকাররা আসতে পারবে এবং তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে।

তার শোবার ঘরটা ছিল বালকসুলভ, সাদামাটা একটা জায়গা। কাবার্ড, খাট, ঘরময় সাঁটানো পুরানো গাড়ির ছবিওয়ালা ওয়ালপেপার। জানালা থেকে দেখা যেত প্রতিবেশীর আধা-শহুরে জংলা উঠান। নিবল এন্ড বাইট শিরোনামওয়ালা পিসি ম্যাগাজিনের একতাড়া সংখ্যা। কম্পিউটার প্রোগ্রামিঙের কিছু বইপত্র। ভিএএক্স/ভিএমএক্স মেশিনের নির্দেশিকা। খুব বেশী নয়, তবে, আর্থার সি. ক্লার্কের অনেকগুলো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর বই। দ্য হিচহাইকারস গাইড টু গ্যালাক্সি। হাই স্কুলের মান্দারিন ভাষার ক্লাসে ব্যবহার করা একটা চাইনিজ ভাষার অভিধান, কারণ, প্রথম চাকরিটা বাঁচানোর জন্য তাকে নিজে নিজেই ভাষাটা শিখতে হয়েছিল।

ড্রপ-ডাউন ড্রয়িং টেবিলের উপরে অ্যাপল ২ই, মডেম, আর ছিল একটা টেলিফোন লাইনএবং বিছানার কাছে ছিল একটা ভাঁজ করা কার্ড টেবিল। বাওয়েন কম্পিউটারের পাশেই টিভি রাখতো, যাতে সে বিছানায় শুয়েই টিভি দেখতে এবং একইসাথে প্যাসিফিক আইল্যান্ড ব্যবহার করতে পারে। এরও পরে, যখন সে জেন শুরু করেছিল, প্যাসিফিক আইল্যান্ডের পাশেই সেটা রেখেছিল। সব মিলিয়ে একটা নিখুঁত ব্যবস্থা।

আজকালকার ইউনিক্স ইন্টারনেট মেশিনের মানের তুলনায় প্যাসিফিক আইল্যান্ড খুব অভিনব কিছু ছিল না। কিন্তু ১৯৮৭ সালে সেটাই ছিল একটা আকর্ষণীয় কম্পিউটার। পিআই, যাকে স্থানীয় ব্যবহারকারীরা বলত ‘পাই’, তাতে ছিল ২০ মেগাবাইটের একটা হার্ড-ড্রাইভ– যা সেই সময়ের ব্যক্তিগত কম্পিউটারের তুলনায় বিশাল জায়গা। পাই বসাতে বাওয়েন একাই ৫০০০ ডলার খরচ করেছিল। সে তার দুইটা সিস্টেমকেই খুব ভালবাসতো এবং প্রতিটার দেখাশোনার পেছনে অনেক সময় ব্যয় করত।

বেশীরভাগ বিবিএসের মতোই, পাই অথবা জেনে একাউন্ট খুলতেও কোনো পয়সা লাগত না। এই ভদ্র চেহারার আধা-যুবক, আধা-বালক আর আধা-বড়মানুষটি অস্ট্রেলিয়ার ধুরন্ধর সব কম্পিউটার এবং টেলিফোন হ্যাকারদের তার বিবিএসে অকাতরে জায়গা করে দিত। সে তার কম্পিউটারগুলোর ব্যয় বহন করতে পারত দুইটা কারণে: প্রথমত, সে তার বাপ-মায়ের সঙ্গে নিজ বাড়িতে থাকত এবং দ্বিতীয়ত, টেলিকমে তার একটা পূর্ণকালীন চাকরি ছিল। টেলিকম ছিল তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র অভ্যন্তরীন টেলিফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান।

পাইতে প্রায় ৮০০ কম্পিউটার ব্যবহারকারী ছিলেন, তাদের মধ্যে ২০০ জনেরও বেশী ছিলেন যাকে বলে, ‘পাঁড়’ ব্যবহারকারী। এরা নিয়মিত আসতেন। পাইয়ের ছিল বাড়ির ফোন থেকে আলাদা ও নিজস্ব ফোন লাইন, যাতে বাওয়েনের বাপ-মা লাইন ব্যস্ত পেয়ে রেগে না যান। পরে, সে জেনের জন্য আরও চারটা অতিরিক্ত ফোন লাইন লাগিয়েছিল, যেখানে প্রায় ২০০০ ব্যবহারকারী ছিল। টেলিকম থেকে প্রাপ্ত ট্রেনিঙের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সে তার বাড়ির জন্য নন-স্ট্যান্ডার্ড অথচ বৈধ কিছু সুবিধা চালু করেছিল, যেমন: জংশন বক্স, মাস্টার সুইচ এইসব। সব মিলিয়ে, বাওয়েনের বাড়ি টেলিযোগাযোগের একটা সরগরম এলাকা ছিল।

[1] ফার্স্টকে প্রথমদিকে সিইআরটি সিস্টেম ডাকা হত। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ ডিফেন্স এর অর্থায়নে তৈরি এবং কার্নেগী মেলন ইউনিভার্সিটি পরিচালিত দ্য কম্পিউটার এমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ছিল সিইআরটি এর একটা আন্তর্জাতিক সংস্করণ।