সোমবার, ১৬ অক্টোবর, ১৯৮৯

নাসার গোডার্ড ফ্লাইট সেন্টার, গ্রিনবেল্ট, মেরিল্যান্ড

মেরিল্যান্ড থেকে ক্যালিফোর্নিয়া, ইউরোপ থেকে জাপান, নাসার বিস্তৃত সাম্রাজ্যে কর্মীরা দিনের শুরুতে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানালেন, নিজ নিজ ইন-ট্রে’র মেইল চেক করলেন, কফি খেলেন, চেয়ারে আরাম করে বসে ফিজিক্সের জটিলতম সমস্যার সমাধানের প্রস্তুতি নিয়ে নিজ নিজ কম্পিউটারে লগইন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেদিন বেশীরভাগ কম্পিউটারই কেমন একটা অদ্ভুত আচরণ শুরু করল।

লগইন করামাত্র স্পষ্ট বোঝা গেল, কেউ বা কিছু একটা কম্পিউটারগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। সিস্টেমের অফিসিয়াল আইডেন্টিফিকেশন ব্যানারের বদলে কম্পিউটারগুলোতে ভেসে উঠল নিচের বার্তাটি:

তোমরা মুখে শান্তির কথা বল, আর, তলে তলে যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও।[1]

 

ওয়াঙ্কড? আমেরিকার বেশীরভাগ কম্পিউটার সিস্টেম ম্যানেজার, যারা ওই ব্যানারটা পড়েছিলেন, ওয়াঙ্ক শব্দটার সাথে পরিচিত ছিলেন না।

নাসার কম্পিউটার সিস্টেমে আবার কারা হানা দিতে পারে? এই ওয়ার্মস এগেনস্ট নিউক্লিয়ার কিলারসই বা কারা? এরা কি কোনো পাগলা গ্রুপ নাকি? এরা আবার কোনো গেরিলা সন্ত্রাসী গ্রুপ নয়তো, হয়তো নাসাকে আক্রমণ করার ধান্ধায় আছে? আর ‘ওয়ার্ম’-ই বা কেন? যেকোনো বিপ্লবী গ্রুপের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ওয়ার্ম নামক প্রাণীটিকে বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে বড্ড বিদঘুটে একটা পছন্দ । ওয়ার্ম বা জীবানু অতি নিম্নপর্বের প্রাণী। যেন ‘জীবানুর মতো ওরাও নিম্নপর্বের কিছু একটা’। ক্ষমতার চিহ্ন হিসেবে কোন পাগল জীবানুকে পছন্দ করতে পারে?

একইভাবে, নিউক্লিয়ার কিলারস নামটাও কম উদ্ভট নয়। তাদের ব্যানারের নীতিবাক্য হল – ‘তোমরা মুখে শান্তির কথা বল, আর, তলে তলে যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও’। শুনে মনে হচ্ছে কথাগুলো ঠিক যেন নাসাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়নি। তারা তো কোনো পারমাণবিক মিসাইল বানায়নি, তারা মানুষকে চাঁদে পাঠিয়েছে। তাদের কিছু কিছু প্রকল্পে হয়তো সামরিক কিছু ব্যাপারস্যাপার আছে, কিন্তু সেসব তো আমেরিকা সরকারের অন্যান্য এজেন্সি, যেমন: ডিপার্টিমেন্ট অফ ডিফেন্সের তুলনায় কিছুই নয়। অন্তত ‘নিউক্লিয়ার কিলার’ নাম কপালে জোটার মতো কিছু তো তারা করেনি। তাহলে প্রশ্ন হল, নাসা কেন আক্রান্ত হল?

আর ওই শব্দটা – ‘ওয়াঙ্কড’। এর কোনো অর্থও বোঝা গেল না। কোনো সিস্টেম ‘ওয়াঙ্কড’ হওয়ার মানেই বা কী হতে পারে?

তবে, সোজা কথায় এসবের অর্থ হল, নাসা তার কম্পিউটার সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

নাসার একজন বিজ্ঞানী সোমবারে একটা আক্রান্ত কম্পিউটারে লগইন করতে গিয়ে পেলেন নিচের বার্তাটি:

Deleted file <filename1>

Deleted file <filename2>

Deleted file <filename3>

Deleted file <filename4>

Deleted file <filename5>

Deleted file <filename6>

এই লাইনগুলোর অর্থ হল, কম্পিউটার, বিজ্ঞানীকে বলছে ‘আমি তোমার সব ফাইল মুছে দিচ্ছি’।

এই লাইন বিজ্ঞানী যদি নিজে নিচের কমান্ড লিখে দিতেন:

delete/log *.*

— তাহলে উপরের মতোই দেখাত। ব্যাপারটা এমন, বিজ্ঞানী ভদ্রমহিলা যেন নিজেই কম্পিউটারকে ফাইলগুলো মুছে ফেলার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

এরপর নাসার বিজ্ঞানী ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই একে একে চোখের সামনে তাঁর ফাইলগুলোকে গায়েব হয়ে যেতে দেখেছেন। একের পর এক; অতল গহ্বরে। নাহ! কিছু তো একটা গড়বড় হয়েছেই। এমনিতে তিনিই হয়তো পুরো প্রক্রিয়াটা থামাতে পারতেন, হয়তো কন্ট্রোল আর C কী চাপলেই কাজ হত। এতে প্রক্রিয়াটা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যেত, আর কম্পিউটারকে দেওয়া নির্দেশটাও তখনই রদ হয়ে যেত।

কিন্তু হায়, কম্পিউটার তো নিয়ন্ত্রণ করছে কোনো এক অনুপ্রবেশকারী, বিজ্ঞানীটি নয়। আর, সেই অনুপ্রবেশকারী কম্পিউটারকে বলেছে, ‘নির্দেশ বলে কিছু নাই। সুতরাং, কোনো নির্দেশ গ্রাহ্য করো না’।

বিজ্ঞানী ভদ্রমহিলা হয়তো আবারো কমান্ড কী-গুলো চেপেছিলেন, এবার হয়তো আরও দ্রুতগতিতে। বারবার, বারবার। তিনি কম্পিউটারের এই উদ্ভট আচরণে হয়তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলেন এবং একইসাথে হয়তো মুষড়েও পড়েছিলেন। সপ্তাহের পর সপ্তাহ অথবা হয়তো মাসের পর মাস ধরে তিনি যে সময় ব্যয় করেছেন বিশ্বজগতের রহস্য উদ্ধার করার পেছনে, তার সবই তখন তার চোখের সামনে গায়েব হয়ে যাচ্ছে, সবই ঘটছে নিরেট কম্পিউটারের বোকামির কারণে। আর পুরো প্রক্রিয়াটাই কিনা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। চলে যাচ্ছে। চলে যাচ্ছে….সব শেষ।

কম্পিউটার কথা না শুনলে মাথা গরম হওয়ারই কথা। আর, তার বহিঃপ্রকাশও হতে পারে অত্যন্ত বিকটভাবে। ভয়ে হাত ভিজে জবজবে হয়ে যেতে পারে, গোঙানি হতে পারে, স্নায়ুতন্ত্রে ব্যথা করতে পারে এবং উন্মাদের মত টেবিল থাপড়ে থাপড়ে চিৎকার করতে পারেন যেকেউ।

ভাবুন তো দেখি, আপনি নাসার কোনো স্থানীয় কম্পিউটার সিস্টেমের ম্যানেজার। ওই সোমবারে আপনি অফিস গেলেন এবং ফোন ধরলেন। প্রত্যেকটা কলই উন্মত্তপ্রায়, কিংকর্তব্যবিমূঢ় নাসা কর্মকতাদের। এবং প্রত্যেকেই অভিযোগ একটাই – তাদের একাউন্টিং রিপোর্ট বা রিসার্চ প্রজেক্টের মতো জরুরী সব ফাইলগুলো কম্পিউটার থেকে আপনাআপনিই গায়েব হয়ে যাচ্ছে।

এক্ষেত্রে জটিলতা আরও বেড়ে গিয়েছিল, কারণ নাসার ফিল্ড সেন্টারগুলো আবার মাঝেমাঝেই প্রজেক্টের জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে থাকে। যখনই কোনো নতুন ফ্লাইট প্রজেক্ট আসে, দুই-তিনটি সেন্টার তাদের শ’খানেক কর্মী নিয়ে সেটা বাগাবার জন্য হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়। সবগুলো কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য, প্রজেক্টের প্রস্তাব এবং বাজেট হারিয়ে ফেলা মানেই হল বাজিতে হেরে যাওয়া এবং ফান্ডিংও খোয়ানো।

কাজেই, নাসা স্প্যান কম্পিউটার নেটওয়ার্ক অফিসের কর্মীদের জন্য দিনটা যে ভালোকিছু বয়ে আনেনি তা বোঝাই যাচ্ছে।

জন ম্যাকম্যাহনের জন্যও দিনটা বিশেষ শুভ ছিল না।

মেরিল্যান্ডে নাসার গোডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের এসিস্টেন্ট ডেকনেট প্রটোকল ম্যানেজার, জন ম্যাকম্যাহনের দিন সাধারণত গোডার্ডের পনেরো থেকে বিশটা ভবনের স্প্যান কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সামলেই কেটে যেত।

২৮ নম্বর ভবনে ম্যাকম্যাহন কোড ৬৩০.৪ নিয়ে কাজ করতেন, যার আরেকটা নাম হল গোডার্ড’স এডভান্সড ডাটা ফ্লো টেকনোলজি অফিস। গোডার্ডের বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সংক্রান্ত যেকোন সমস্যায় তাঁকেই ফোন করতেন। সবথেকে সাধারণ যে বাক্যগুলো তাকে শুনতে হত সেগুলো হল, ‘অমুক জিনিসটা কাজ করছে না’ অথবা ‘আমি অমুক নেটওয়ার্কে ঢুকতে পারছি না।’

স্প্যান মানে হল স্পেস ফিজিক্স এনালাইসিস নেটওয়ার্ক, যেটা দুনিয়াব্যাপী প্রায় ১,০০,০০০ কম্পিউটার টার্মিনালকে পরস্পর সংযুক্ত করার কাজ করত। ইন্টারনেট তো এতোদিনে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়েছে। এই নেটওয়ার্কটাও অনেকটা ইন্টারনেটের মতোই, তবে স্প্যান শুধুমাত্র নাসা, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেমন: বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আর বিজ্ঞানীদেরকেই পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করত। স্প্যানের কম্পিউটারগুলো, ইন্টারনেটের কম্পিউটারগুলো থেকে কারিগরি দিক দিয়েও আলাদা, কারণ, এগুলো ভিন্ন অপারেটিং সিস্টেমে চলত। ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে কম্পিউটারগুলোর বেশীরভাগই ইউনিক্স অপারেটিং সিস্টেম নির্ভর হয়ে থাকে; কিন্তু, স্প্যান প্রাথমিকভাবে ভিএমএস অপারেটিং সিস্টেম চালিত ভিএএক্স কম্পিউটারের উপর নির্ভরশীল। এই নেটওয়ার্কের কার্যপ্রণালী অনেকটাই ইন্টারনেটের মতো, তবে কম্পিউটারগুলোর ভাষা ছিল আলাদা। ইন্টারনেটের ‘ভাষা’ টিসিপি/আইপি, কিন্তু স্প্যানের ‘ভাষা’ ডেকনেট।

এই কারণে স্প্যান নেটওয়ার্ক ডেকনেট ইন্টারনেট নামেও পরিচিত ছিল। এর বেশীরভাগ কম্পিউটারের প্রস্তুতকারণ হল ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট কর্পোরেশন ইন ম্যাসাচুসেটস, তাই এর নামও ডেকনেট। ডেক শক্তিশালী কম্পিউটার বানিয়ে থাকে। স্প্যানে ব্যবহৃত প্রতিটা ডেক কম্পিউটারে ন্যূনতম ৪০টি টার্মিনাল থাকত। কোনো কোনো কম্পিউটারে এরচেয়েও বেশী থাকত। একটা ডেক কম্পিউটারের পক্ষে ৪০০ জনের কাজ সামলানো কোনো ব্যাপারই না। মোটকথা, এক মিলিয়ন বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং অপরাপর বিজ্ঞানীদের এক-চতুর্থাংশই এই কম্পউটার নেটওয়ার্কটি ব্যবহার করতেন।

ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করা ম্যাকম্যাহন নাসার কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড এক্সপ্লোরার প্রজেক্ট থেকে এখানে এসেছিলেন। তখন সেখানে তাঁকে মাত্র কয়েকশ’ গবেষকের কম্পিউটার সামলাতে হত। গোডার্ডের ৭ নম্বর ভবনে তিনি কোবে প্রজেক্টে কাজ করতেন। সেখানে তখন এক চাঞ্চল্যকর গবেষণা চলছিল। প্রজেক্টের দলটি তখন পুরো দুনিয়ার মানচিত্র বানানোর কাজ করছিল। আর এই কাজ তারা করছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। ১৯৮৯ সালে নাসা কোবে স্যাটেলাইট ছাড়বে বলে ঠিক করে। এর কাজ হল ‘নির্ধারিত মহাকাশীয় সীমায় অতীত মহাশুন্যের ডিফিউস ইনফ্রারেড এবং মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন মাপজোখ করা।’[2] সাধারণ মানুষের কাছে পুরো বিষয়টাকে অনেকটা মডার্ন আর্টের মতো দুর্বোধ্য কিছু একটা বা ‘অবলোহিত রশ্মি ব্যবহার করে মহাকাশের মানচিত্র তৈরি করার’ মত কিছু একটা মনে হতে পারে।

১৬ অক্টোবর ম্যাকম্যাহন অফিসে এসে যেইমাত্র থিতু হয়ে বসলেন, সঙ্গে সঙ্গে স্প্যান প্রজেক্ট অফিস থেকে আচমকা একটা ফোনকল এলো। ন্যাশনাল স্পেস সায়েন্স ডাটা সেন্টার, যারা নাসার অর্ধেক স্প্যান নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে, তাদের প্রতিনিধি টড বাটলার এবং রন টেনকাটি কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অদ্ভুত এবং নিশ্চিতভাবেই অননুমোদিত একটা কিছুর তৎপরতা আবিষ্কার করেছেন। ভাবগতি দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা কম্পিউটার ওয়ার্ম।

কম্পিউটার ওয়ার্ম হল কম্পিউটার ভাইরাসের মতো এক ধরণের ছোট্ট প্রোগ্রাম। কম্পিউটার সিস্টেমের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা দিয়ে এরা আক্রমণ করে। সুবিধাজনক যেকোন কম্পিউটার নেটওয়ার্ক দিয়ে এরা ঢুকে পড়তে পারে এবং নেটওয়ার্ক সিস্টেমের দোরগোড়ায় এসে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে পারে। কম্পিউটার সিস্টেমের নিরাপত্তাব্যবস্থায় যদি কোনো ফাঁকফোঁকর থাকে তাহলে এরা সেই ফোঁকর গলে সিস্টেমে প্রবেশ করে। আর একবার এই কাজটা করতে পারলে এরা পূর্বনির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ করতে পারে। সিস্টেম দখলে নেওয়ার জন্য এরা তাদের নির্মাতাকে বার্তা পাঠাতে পারে। ভাইরাস বা অন্যান্য প্রোগ্রামের সাথে ওয়ার্মের পার্থক্য হল এরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। এরা নিজে নিজেই এগোতে পারে, নতুন সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে। ভাইরাসের মতো এরা ডাটা ফাইল বা প্রোগ্রামকে বাধা দেয় না। এরা স্বয়ংক্রিয়।[3]

ওয়ার্ম নামটি এসেছে জন ব্রুনারের ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ক্লাসিক সায়েন্স ফিকশন দ্য শকওয়েভ রাইডার থেকে। উপন্যাসে দেখা যায় একজন বিদ্রোহী কম্পিউটার প্রোগ্রামার ‘টেপওয়ার্ম’ নামের একটা প্রোগ্রাম তৈরি করে স্বৈরাচারী সরকারের জননিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহৃত একটা গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ছেড়ে দেয়। ওই ওয়ার্মটাকে নির্মূল করার জন্য সরকারকে তখন বাধ্য হয়ে ওই কম্পিউটার নেটওয়ার্কটা বন্ধ করে দিতে হয়। আর এভাবেই তাদের সব কর্তৃত্ব নির্মূল হয়ে যায়।

ব্রুনারের গল্পই এখন দেখি সত্য হবার দশা। যদি এইবার ভিএমএস কম্পিউটারের ম্যানেজাররা এইরকম ধূর্ত কোনো ওয়ার্মের দেখা সত্যি সত্যিই পেয়ে যান, তাহলে গল্পের কথাই ফলে যাবে। ১৯৮০’র গোড়ার দিকেও ওয়ার্ম নিয়ে সকলের ধারণা ছিল অস্পষ্ট। ল্যাবরেটরির গবেষণার জন্যই এসব বেশী ব্যবহার করা হত। উদাহরণস্বরূপ, জেরক্সের গবেষকেরা কিছু উপকারী ওয়ার্ম তৈরি করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল কম্পিউটারের বিভিন্ন সুবিধাকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা।[4] তারা ‘টাউন ক্রায়ার ওয়ার্ম’ নামের একটা ওয়ার্ম তৈরি করেছিলেন, যার কাজ ছিল নেটওয়ার্কে ঘুরে বেড়ানো এবং জরুরী ঘোষণা প্রচার করা। তাদের ‘ডায়াগনস্টিক ওয়ার্ম’ও নেটওয়ার্কে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু, এই ওয়ার্ম তৈরি করা হয়েছিল মেশিনের বিভিন্ন সমস্যা নির্ণয় করার জন্য।

কোনো কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রামারের কাছে ওয়ার্ম তৈরি করা যেন সত্যিকার প্রাণ তৈরি করারই সামিল। বুদ্ধিমান একটা জিনিস, যা কিনা নিজে নিজেই ঘুরে বেড়াতে পারে এবং সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে – এমন কিছু একটা তৈরি করতে পারা সৃষ্টিশীলতার সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রকাশই বটে। সেদিক থেকে দেখলে, নাসার কম্পিউটার সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ধূর্ত একটা ওয়ার্ম তৈরি করতে পারাটা অমরত্ব অর্জনের মতোই কিছু একটা — যেসব কম্পিউটার মানুষকে চাঁদে পাঠিয়েছে সেসবের মধ্যে নিজেই যেন বিলীন হয়ে যাওয়ার মতো একটা কান্ড।

নাসার সব কম্পিউটার স্ক্রিনগুলোতে যেদিন ওয়াঙ্ক ব্যানার ভেসে উঠলো সেদিন পর্যন্তও মাত্র দুটি বুদ্ধিমান ওয়ার্মের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। এদের একটা হল আরটিএম, মাত্র বারো মাস আগে যা ইউনিক্স-ভিত্তিক ইন্টারনেটে সংক্রমিত হয়। আরেকটা হল, প্রথম ভিএমএস ওয়ার্ম, যেটা ফাদার ক্রিসমাস নামে পরিচিত।

ফাদার ক্রিসমাস ছিল ছোট্ট, সাধারণ একটা ওয়ার্ম। এটা সংক্রমিত কোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্কের স্থায়ী ক্ষতি করেনি। ১৯৮৮ সালের ক্রিসমাসের আগেরদিন ওই ওয়ার্ম ছড়িয়ে পড়ে। শ’খানেক ভিএমএস মেশিনে সেটা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে এবং ক্রিসমাসের দিনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ক্রিসমাসের সকালে সেটা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং প্রবল উৎসাহে কাজ শুরু করে দেয়। ব্যালকনির উপর থেকে রংবেরঙের নিশান ফেললে তা যেমন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি করেই সংক্রমিত সকল কম্পিউটার সিস্টেমের ব্যবহারকারীদের কাছে ওইদিন ক্রিসমাসের শুভেচ্ছাবার্তা ছড়িয়ে পড়ল। সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের কেউ এই ক্রিসমাস কার্ডপ্রাপ্তি থেকে বাদ গেল না। কার্য সমাধা হল, ওয়ার্মও হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। জন ম্যাকম্যাহন তখন ফাদার ক্রিসমাসকে মোকাবেলা করার প্রধান টিমের সদস্য ছিলেন।

১৯৮৮ সালের ক্রিসমাসের কিছুদিন আগে, প্রায় বিকাল ৪টার দিকে, ম্যাকম্যাহনের এলার্ম-মনিটরিং প্রোগ্রামগুলো একে একে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে লাগলো। ম্যাকম্যাহন ওয়ার্নিং বেল বাজানো ডজনখানেক  ইনকামিং কানেকশনের উৎস অনুসন্ধান করতে শুরু করলেন। পরক্ষণেই তিনি বুঝতে পারলেন লাইনগুলোর অপরপ্রান্তে আসলে কোনো মানুষের অস্তিত্ব নাই। আরও অনুসন্ধানের পর তিনি দেখলেন হাই ডটকম নামের একটা অচেনা প্রোগ্রাম তার সিস্টেমের ভিতরে প্রবেশ করেছে। হাই ডটকম যেসব কোড প্রিন্ট দিচ্ছিল সেসব পড়ামাত্র তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। এটা তো একটা ওয়ার্ম! তিনি জিন্দেগীতে কখনো ওয়ার্ম দেখেন নাই।

তিনি দৌড়ে তার কনসোলের কাছে গেলেন এবং সিস্টেমটাকে যতদ্রুত সম্ভব বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। বন্ধ করার সঠিক নিয়মকানুনও তিনি ঐদিন মানেন নাই। কিন্তু, মনে মনে ভাবলেন, মানুষ হয়তো সত্যিকার ঘটনা জানার পরে তার এই কাজকে বোকামি বলে গালাগাল করবে না। নিজের অংশের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়ার পর তিনি লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্কিং অফিসে রিপোর্ট করলেন। প্রিন্ট করা পাতাগুলো একহাতে নিয়ে নেটওয়ার্ক অফিসের দিকে দিলেন ছুট। সেখানে গিয়ে সেদিন তিনি এবং অন্যান্য ম্যানেজারেরা মিলে শেষপর্যন্ত ওয়ার্মটাকে ঠেকানোর একটা বুদ্ধি বের করতে পেরেছিলেন। একইসাথে তারা জানতে পেরেছিলেন, ফাদার ক্রিসমাস ওয়ার্মটি তাদের সিস্টেমে ঢুকানো হয়েছিল সম্ভবত সুইজারল্যান্ড থেকে। কিন্তু কে বা কারা সেটা বানিয়েছিল সেটি আর বের করা সম্ভব হয়নি।

ফাদার ক্রিসমাসকে একটা সাধারণ ওয়ার্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি, একে বিপদজনক হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়নি, কারণ এটা সিস্টেমে স্থায়ীভাবে অবস্থান করেনি। এটা ছিল একটা তারিখ-ভিত্তিক ওয়ার্ম।

সেই তুলনায়, স্প্যান প্রজেক্ট অফিসের কোনো ধারণাও নাই ওয়াঙ্ক আক্রমণকারীরা কী কী করতে সক্ষম। তারা জানেওনা কারা এটা লিখেছে এবং ছেড়ে দিয়েছে। তবে, তাদের এই ধরণের সমস্যা মোকাবেলা করার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু ম্যাকম্যাহন কী এবারে পারবেন?

অতীতে ফাজহেড ছদ্মনামধারী, বন্ধুবৎসল চরিত্রের কম্পিউটার প্রোগ্রামার, জন ম্যাকম্যাহন সবসময় জটিল চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন। তিনি একইসথে কৌতুহলী এবং অনুসন্ধানী চরিত্রের মানুষ। তিনি স্প্যান প্রজেক্ট অফিসকে সেই অচেনা অনুপ্রবেশকারীর কাজকর্মের অনুলিপিগুলো তার কাছে পাঠানোর জন্য বললেন। স্প্যান তখন ওয়ার্ম আক্রমণের ক্রাইসিস সেন্টারে পরিণত হয়েছে। তিনি সোর্স কোডের সাতটি প্রিন্টেড কপি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন এবং জিনিসটা আসলে কী কী কাজ করেছে সেসব বুঝতে চেষ্টা করলেন।

এর আগের বদমাশ ওয়ার্ম দুটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কতকগুলো কম্পিউটার সিস্টেম এবং নেটওয়ার্কে হামলা করেছিল। কিন্তু, এবার, ওয়াঙ্ক ওয়ার্মটি শুধুমাত্র ভিএমএস কম্পিউটার সিস্টেমকে আক্রমণ করেছে। তবে, এবারের সোর্সকোডগুলো ম্যাকম্যাহনের দেখা আগের কোনোটারই মতো নয়। তার ভাষ্যে, ‘এটা যেন এক স্তুপ স্প্যাগেটির মধ্যে চিমটা চালানোর মতো কাজ। আপনি যখন এক গোছা তুলে নিয়ে ভাবতে বসবেন “আচ্ছা! এইটাই তাইলে নষ্টের গোড়া!” কিন্তু তখনই অবশিষ্ট অগোছালো স্তুপের দিকে আপনার নজর পড়বে।’

গ্রোগ্রামটা, আর দশটা সাধারণ প্রোগ্রামের মত ডিজিটাল কমান্ড ল্যাংগুয়েজ বা ডিসিএলে সুন্দর করে গুছিয়ে লেখা নয়। যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লেখা। দশ থেকে পনেরো লাইনের কোড নিয়ে কাজ করতে করতেই ম্যাকম্যাহনকে হয়তো আবার একদম শুরুতে গিয়ে মিলিয়ে নিতে হচ্ছিল, যাতে বোঝা যায় পরবর্তী অংশটার কাজ কী। তিনি আস্তে-ধীরে সব নোট করছিলেন, ধৈর্য্য ধরে নাসার কম্পিউটারে ওয়ার্মটার কার্যপ্রণালীর একটা খসড়া চিত্র দাঁড় কারনোর চেষ্টা করছিলেন।

কেনেডি স্পেস সেন্টারে জড়ো হওয়া পরমাণু-বিরোধী দলগুলোর জন্য আজ একটা বড় দিন হতে পারত। ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের রায়ে তারা হেরে গেলেও, হাল ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না। তাই তারা আপীল কোর্টে তাদের মামলা নিয়ে গিয়েছিল।

১৬ অক্টোবর খবরটা বেরোলো। আপীল কোর্টও নাসার পক্ষে রায় দিয়েছে।

বিক্ষোভকারীরা আবারো কেনেডি স্পেস সেন্টারের সামনে জড়ো হল। সেখান থেকে কমপক্ষে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হল। সেন্ট লুইস পোস্ট-ডিসপ্যাচ এএফপির একটি ছবিকে ব্যবহার করল। ছবিতে দেখা গেল ৮০ বছর বয়ষ্ক এক বৃদ্ধকে পুলিশ ট্রেসপাসের দায়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ফ্লোরিডা কোয়ালিশন ফর পিস এন্ড জাস্টিসের জেন ব্রাউন ঘোষণা দিলেন, ‘এর মধ্যদিয়েই মহাকাশে নিউক্লিয়ার শক্তি ও অস্ত্র ব্যবহারের সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সূচনা হল। এর মধ্যে স্টার ওয়ারস প্রোগ্রামও আছে।’

কেনেডি সেন্টারের ভিতরেও কোনোকিছু ঠিকঠাক চলছিল না। গত সোমবারে, নাসার কারিগরি বিশেষজ্ঞরা আরও একটা সমস্যা খুঁজে পেয়েছেন। স্পেস শাটলের নেভিগেশন সিস্টেমের জন্য গতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত ব্ল্যাক বক্সটি ছিল ক্রটিপূর্ণ। টেকনিশিয়ানরা তাই ককপিট ডিভাইস পরিবর্তন করতে শুরু করেছিলেন। এজেন্সির মুখপাত্র গণমাধ্যমগুলোকে আস্বস্ত করে বললেন, মঙ্গলবারের উৎক্ষেপণ নিয়ে আর কোনো বিলম্বের অভিপ্রায় নাসার নাই। দিনগণনা যথারীতি চলতে থাকল। সবকিছুই নাসার নিয়ন্ত্রণে চলে এলো।

সবকিছুই, শুধুমাত্র আবহাওয়াটা বাদে।

চ্যালেঞ্জার বিপর্যয়ের পর নাসার চৈতন্য হয়েছে। নাসার উৎক্ষেপন নির্দেশনা আরও কঠোর করা হয়েছে। বাজে আবহাওয়া উটকো ঝুঁকি তৈরি করে, তাই, নাসা এবার মনেপ্রাণে চাইছে বাজে আবহাওয়া কেটে যাক। যদিও, আবহাওয়াবিদগণ অনুমান করছেন মঙ্গলবার উৎক্ষেপনের সময় অনুকূল আবহাওয়া থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৮০%। কিন্তু, তবুও শাটলটাকে শুধুমাত্র অনুকূল সময় হলেই ছাড়তে হবে, কারণ, অনেকদিন ধরেই আবহওয়া থমথমে হয়ে আছে।

মঙ্গলবার চলে এলে গ্যালিলিওর কর্মীদের দম যেন আর পড়তে চায় না। শাটল উৎক্ষেপনের সময় বেলা ১২.৫৭ এর দিকে গড়াতে লাগল। পরমাণু-বিরোধী বিক্ষোভকারীরা যেন চুপ মেরে গেলেন। আশার ক্ষীণ আভা দেখা দিল। শেষপর্যন্ত গ্যালিলিও হয়তো যেতে পারবে।

আর তখনই, উৎক্ষেপনের ঠিক দশ মিনিট আগে নিরাপত্তাসংকেত বেজে উঠলো। কেউ একজন উৎক্ষেপন এলাকার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী ছুটে গেল, দ্রুত তারা অনুপ্রবেশকারীকে ধরে ফেলল… একটা বন্য শূকর!

শূকরটাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হল, সময়গণনা চলতে থাকল। সেইসাথে ভারী মেঘও গড়াতে গড়াতে লঞ্চপ্যাডের ছয় কিলোমিটার উপর দিয়ে স্পেস শাটলের ইমার্জেন্সি রানওয়ের দিকে চলে এলো। নাসার উৎক্ষেপণ প্রধান রবার্ট সিয়েক পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সময় টি মাইনাস নাইন মিনিট পিছিয়ে দিলেন। আটলান্টিসের হাতে আর ২৬ মিনিটের মতো সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে উৎক্ষেপন সম্ভব না হলে টেক-অফ পিছিয়ে নিতে হবে, সম্ভবত বুধবার পর্যন্ত।

আবহওয়ার কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না।

বেলা ১.১৮ মিনিট, আটলান্টিসের সময় তখন টি মাইনাস ফাইভ মিনিটে চলে এসেছে, সিয়েক উৎক্ষেপন পিছিয়ে বুধবারে নিয়ে গেলেন।

এদিকে স্প্যান সেন্টারে উত্তেজনা বাড়ছিল। ওয়ার্মটা আরও অনেক সিস্টেমে ছড়িয়ে পড়ছিল, তাই মিনিটে মিনিটে ফোনও বেজে উঠছিল। সবখান থেকে একই কথা, নাসার কম্পিউটার আক্রান্ত।

স্প্যান প্রজেক্টের কর্মীদের দরকার আরও লোকবল। তাদেরকে একইসাথে উত্তেজিত ফোনদাতাদের শান্ত করতে হচ্ছিল এবং অচেনা প্রোগ্রামটার গতিবিধি বিশ্লেষণের দিকেও মনোযোগ দিতে হচ্ছিল। বিষয়টা কী নিছক একটা ফাজলামি নাকি আসলেই বড় কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা আছে? এসবের পেছনে কারা জড়িত?

নাসা ওয়াঙ্কের ব্যাপারে ঘুনাক্ষরেও চিন্তা করে নাই। কোনো কোনো কর্মী জানতেন যে বাইরে বিক্ষোভকারীরা রয়েছে, কিন্তু, এইরকম কোনোকিছুর জন্য তারা আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না। তবে, নাসার কর্মকর্তারা এখন নিশ্চিত যে, গ্যালিলিও নিয়ে বিক্ষোভ এবং এরমাঝে নাসার কম্পিউটারে আক্রমণের উদ্দেশ্য আসলে জনসম্মুখে দুটো ঘটনার যোগসূত্র প্রচার করা। একথায় যুক্তি আছে বটে, তবে, আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা রয়ে গেছে।

স্বাভাবিকভাবেই স্প্যান অফিসে সবাই থমথমে গলায় ফোন করছিল। ফোনের অপরপ্রান্তের মানুষজন ভীত-সন্ত্রস্ত্র। নাসার নির্দিষ্ট কিছু স্প্যান নেটওয়ার্ক, যেমন: মার্শাল স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের  দায়িত্বে থাকা,  ম্যানেজারদেরও অনেক ফোন পাওয়া যাচ্ছিল। তাদের কেউ কেউ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে, কেউ কেউ বিরক্তিভরা গলায় কথা বলছিলেন। সকাল সকাল নিয়ন্ত্রণহারা ২৫টি ভিন্ন ভিন্ন সিস্টেম এডমিনিস্ট্রেটরদের কল পেয়ে অবস্থা একেবারে নাজেহাল। আর, এসব ঘটনা ম্যানেজারদের চাকরি চলে যাওয়ার জন্যও যথেষ্ট।

আসলে বেশীরভাগ ফোনদাতারই এখন দরকার সঠিক নির্দেশনা। তাদের কম্পিউটারে এই পাজি ওয়ার্মটা ঢুকলো কী করে? এটা কী ক্ষতিকর? এটা কী হাতের কাছে পেলেই সব বৈজ্ঞানিক তথ্য ধ্বংস করে ফেলবে? একে ঘায়েল করতে হলে কী করতে হবে?

স্প্যান নেটওয়ার্কে নাসা বিপুল পরিমাণ তথ্য জমা করে রেখেছিল। এগুলোর কোনোটাই অবশ্য গোপনীয় নয়, কিন্তু, অত্যন্ত মূল্যবান। মিলিয়ন মিলিয়ন শ্রমঘন্টা ব্যয় করে এগুলো সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কাজেই, নাসা স্প্যান প্রজেক্ট অফিসের ক্রাইসিস টিমকে বিপুল পরিমাণ তথ্য ধ্বংসের এমন খবর পাওয়ামাত্র সতর্ক হতেই হল। মানুষ ফোন করে করে জানাচ্ছিল ওয়ার্মটা ফাইল মুছে দিচ্ছে।

যেকোন কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ম্যানেজারের জন্য এসব দুঃস্বপ্নের মত। আর, বিষয়টা এতোটাই জটিল যে, ক্রাইসিস টিম তাদের অলীকতম কল্পনাতেও এর ফলাফল চিন্তা করতে পারছে না।

তাছাড়া ওয়ার্মটার গতিবিধিও অসংগতিপূর্ণ। কিছু কিছু কম্পিউটারে এটা শুধুমাত্র বেনামী বার্তা পাঠাচ্ছিল। সেগুলোর কোনো কোনোটা মজার, কোনোটা উদ্ভট আর কিছু কিছু উদ্ধত অথবা অশ্লীল। কোনো ব্যবহারকারী লগইন করামাত্র স্ক্রিনে ভেসে উঠল:

মনে রেখো, যদি তোমরা এই ইঁদুর-দৌড়ে জিতেও যাও —

তোমরা তবুও ইঁদুরের চেয়ে বড়কিছু নও।

কোনোটা আবার বোকা বোকা রসিকতা:

আলোর চেয়ে দ্রুতগতির কিছুই নাই…. নিজেকে যদি প্রমাণ করতে চাও,

তাহলে ফ্রিজের বাতি জ্বলার আগেই দরজা খুলে দেখাও।

আবার কেউ কেউ পেয়েছেন প্যারানয়া আক্রান্ত কর্তৃত্ববিরোধী লোকেদের বুলি:

এফবিআই তোমাকে দেখছে।

অথবা

নৈরাজ্যবাদীদের ভোট দাও।

কিন্তু এসব বার্তাপ্রাপ্ত সিস্টেমগুলোতে কোনো ফাইল খোয়া যেতে দেখা যায়নি। আপাতদৃষ্টিতে এলোমেলোভাবে ফাইল মুছে দেওয়ার এইসব ঘটনা হয়তো অনাগত কোনো অশনী সংকেতেরই ইশারা- হতে পারে আগে থেকেই নির্ধারিত কোনো সময়ে, যেমন হয়তো মধ্যরাতের জন্য তুলে রাখা কোনো সর্বাত্মক আক্রমণেরই মহড়া এটা। অথবা, হয়তো নিছকই কোনো অসতর্ক ব্যবহারকারীর অনিচ্ছাকৃত কি-স্ট্রোকেও এমনটা হতে পারে, যেটা হয়তো সামান্য ক্ষতি করেছে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন ওয়ার্মের কারণেই ঘটেছে। শুধুমাত্র একটা কি-স্ট্রোকের কারণেও অপরিবর্তনীয় কমান্ড চালু হয়ে ওই সিস্টেমের সবকিছু মুছে যেতে পারে।

নাসা স্প্যান কম্পিউটার টিমটাকে ওয়ার্মের সাথে রীতিমতো প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছিল। ওয়ার্মটা কী কী করেছে সেসবের হিসাব করতে তাদের যে সময় ব্যয় হচ্ছিল তাতোটুকু সময়ের মধ্যেই ওয়ার্মটা নেটওয়ার্কের আরও গভীর থেকে গভীর  অংশে চলে যাচ্ছিল। প্রতিটা সমস্যা সমাধান করতে নাসার যতো সময় ব্যয় হচ্ছিল সেই সময়টুকুতে ওয়ার্মটাও বসে ছিল না। সেও খুঁজে খুঁজে নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ভেঙে ঢুকে পড়ছিল।  সুতরাং, সবগুলো কম্পিউটারের জন্য সমাধান খুঁজতে গিয়ে পুরো একটা দিন ব্যয় করলে, ঈশ্বর জানেন, ততক্ষণে কতো ডজন কম্পিউটারে নতুন করে ওয়ার্মের সংক্রমণ ঘটে যাবে। স্প্যান টিমকে নাকি এইরকম ওয়ার্মকেই একেবারে নির্মুল করতে হবে, তাও যা করার করতে হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে।

কোনো কোনো নেটওয়ার্ক ম্যানেজারের আত্মা ভয়ে শুকিয়ে গেল। নাসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেন্টার, ক্যালিফোর্নিয়ার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিজ থেকে স্প্যান অফিসে কল এলো। এই সেন্টারটা ৬৫০০ জন কর্মচারী নিয়ে গঠিত এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির (ক্যালটেক) সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

জানা গেল, নেটওয়ার্ক থেকে জেপিএল নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেছে।

ওয়ার্মের ঝুঁকিই এর কারণ। নিরাপদ থাকার একমাত্র উপায় হল কম্পিউটারগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। তাই, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত নাসার অন্যান্য অংশের সঙ্গে যাবতীয় স্প্যান ডেক-ভিত্তিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে তারা। এতে স্প্যান টিমের জন্য বিষয়টা মোকাবেলা করা আরও কঠিন হয়ে গেল; কারণ, জেপিএল ও এরকম অন্যান্য আরও যেসব প্রতিষ্ঠান সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, এর ফলে তাদেরকে ওয়ার্ম ধ্বংসকারী প্রোগ্রাম পৌঁছে দেওয়া জটিল হয়ে পড়বে। এরকম অবস্থায় সব কাজ টেলিফোনে করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

তারচেয়েও বড় বিপদের কথা হল, জেপিএল ছিল নাসার স্প্যান কম্পিউটার নেটওয়ার্কগুলোর পাঁচটা রাউটিং সেন্টারের একটা। এটা যেন একটা অক্ষের কেন্দ্রস্থল। আর, এই কেন্দ্র থেকে স্পোকের মতো ছড়িয়েছিল ডজনখানেক উপকেন্দ্র – যেগুলোর প্রত্যেকের সঙ্গেই সংযুক্ত ছিল একটা করে স্প্যান সাইট। এগুলোকে বলা হত টেইলসাইট। এগুলোর সবই স্প্যানে সংযুক্ত হওয়ার জন্য এই ল্যাব সাইটের উপর নির্ভরশীল ছিল। জেপিএল নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ায়, টেইলসাইটগুলোও বন্ধ হয়ে গেল।

ভার্জিনিয়ারর স্প্যান অফিসের কর্মীরা এতে জটিল সমস্যার সম্মুখীন হলেন। নাসা স্প্যান-এর নিরাপত্তা প্রধান রন টেনকাটির ভাষ্যে, এভাবে রাউটিং সেন্টারকে বন্ধ করে দিলে বড় সমস্যা হবে। কিন্তু, তার হাতও বাঁধা। যদিও পুরো নেটওয়ার্কেই স্প্যান কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব আছে, তবুও, তারা ওয়ার্মের ব্যাপারে কোনো স্বতন্ত্র ফিল্ড সেন্টারকে নির্দেশ দিতে পারে না। এটা সেন্টারের নিজেদের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। স্প্যান টিম বড়জোড় তাদের উপদেশ দিতে পারে এবং ওয়ার্মটাকে ধ্বংস করার রাস্তা খোঁজায় মনোযোগ দিতে পারে।

স্প্যান অফিসে জন ম্যাকম্যাহনের আবার ডাক পড়ল। এইবারের অনুরোধ আরও জোরালো। কিন্তু তিনি কী এই দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারবেন?

ম্যাকম্যাহনের অফিস থেকে স্প্যান সেন্টারের দূরত্ব মাত্র ৮০০ মিটার। তার বস, ডেকনেট প্রটোকল ম্যানেজার, জেরোম বেনেট, সায় দিলেন। বিপর্যয়মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ম্যাকম্যাহনকে নিযুক্ত করা হল।

ম্যাকম্যাহন নাসা স্প্যান প্রজেক্ট অফিসের ২৬ নম্বর ভবনে পৌঁছামাত্র নাসা ক্রাইসিস টিমের কেন্দ্রের একজন হয়ে গেলেন। তার সঙ্গে আরও আছেন টড বাটলার, রন টেনকাটি এবং প্যাট সিজন। দরকারি আরও লোকজন সময়ে সময়ে এসে যোগদান করলেন, যেমন: ডেভ পিটারস এবং ডেভ স্টার্ন। গোডার্ডের ন্যাশনাল স্পেস সায়েন্স ডাটা সেন্টার এর প্রধান এবং স্প্যানের সর্বোচ্চ বস, জিম গ্রিন, ঘন্টায় ঘন্টায় রিপোর্ট দেওয়ার আদেশ দিলেন। শুরুতে কোর টিমে শুধুমাত্র নাসার লোকজনদের; বিশেষত গোডার্ডের লোকজনদের নেওয়া হলেও, পরবর্তীতে আমেরিকা সরকারের অন্যান্য অংশ থেকেও লোকজন নিয়ে টিমে অন্তর্ভূক্ত করা হল।

ইতিমধ্যে ওয়ার্ম নাসার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ল।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জির দুনিয়াব্যাপী বিস্তৃত হাই-এনার্জি ফিজিক্স নেটওয়ার্কের কম্পিউটারগুলোতেও ওয়ার্মটা হানা দিলো। ইউরো-হেপনেট এবং ইউরো-স্প্যান নিয়ে গঠিত হেপনেট নামে পরিচিত এই নেটওয়ার্কটাও স্প্যান নেটওয়ার্ক চালিত আরেকটা প্রতিষ্ঠান। নাসার নেটওয়ার্ক এবং ডেক কম্পিউটারের অন্যান্য ডিওই নেটওয়ার্কগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। বিভিন্ন রিসার্চ ল্যাবরেটরিগুলোর তো বিভিন্ন কাজে একইসাথে হেপনেট এবং নাসা স্প্যানের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার দরকার পড়তে পারে। সেইকথা মাথায় রেখে, কাজের সুবিধার জন্য এই ল্যাবরেটিগুলো যেন চাইলেই এই দুটি নেটওয়ার্কে ঢুকতে পারে সেই ব্যবস্থা করা ছিল। নাসার স্প্যান এবং ডিওইর হেপনেট – দুয়ে মিলেই বস্তুত, একটা বিরাট কম্পিউটার নেটওয়ার্ক। তাই, ওয়ার্মটারও হয়তো লক্ষ্য ছিল এই বিরাট নেটওয়ার্কটাতে হামলা করবে।

এনার্জি ডিপার্টমেন্ট তাদের এই কম্পিউটারগুলোতেই গোপন দলিলপত্র রাখত। এগুলো খুবই গোপন দলিল। ডিওইতে দুই ধরণের দল আছে: একদল যারা বেসমারিক এনার্জি প্রজেক্টগুলোর জন্য গবেষণা করে এবং আরেকদল পারমাণবিক বোমা বানায়। কাজেই, ডিওই নিজেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে খুবই সচেতন, বা, বলা যেতে পারে “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার” ব্যাপারে খুবই সচেতন। যদিও কোনো গোপন দলিল আদান-প্রদানের জন্য হেপনেট তৈরি করা হয়নি, তবুও, ডিওই এর কম্পিউটার ম্যানেজারেরা আক্রান্ত হওয়ামাত্র সামরিক সাহায্য চাইল। ভিএমএস কম্পিউটার সিস্টেম সম্পর্কে বিশদ জানেন এমন একজন লোককে ধরে নিয়ে আসলো এবং নিয়োগ দিলো: তার নাম কেভিন ওবারম্যান।

ম্যাকম্যাহনের মতো, ওবারম্যানও আগে কখনো কম্পিউটার নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন নাই। তিনি নিজেই কম্পিউটার নিরাপত্তা বিষয়ে আগ্রহী হয়েছিলেন এবং তার কর্মক্ষেত্রে সবাই তাকে একজন ভিএমএস সিস্টেম ও সেই সিস্টেমের নিরাপত্তা সম্পর্কে ভালো জানাশোনাওয়ালা লোক বলে জানত। চাকরিজীবনে তিনি সান ফ্রান্সিসকোরর কাছে ডিওই-অর্থায়নে পরিচালিত লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির (সংক্ষেপে এলএলএনএল) ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।

[1] ।

[2] From NASA’s World Wide Web site

[3] Thomas A. Longstaff and E. Eugene Schulz, ‘Analysis of the WANK and OILZ Worms’, Computer and Security, vol. 12, no.1, February 1993, p.64.

[4] Katie Haffner and John Markoff, Cyberpunk, Corgi, London 1994, p. 363.