অধ্যায় ১

১০, ৯, ৮, ৭, ৬, ৫, ৪, ৩, ২, ১

 

সোমবার, ১৬ অক্টোবর ১৯৮৯

কেনেডি স্পেস সেন্টার, ফ্লোরিডা

আসন্ন উৎক্ষেপনের উত্তেজনায় নাসা যেন মুখর হয়ে উঠল। ‘গ্যালিলিও’ শেষমেশ বৃহস্পতিতে যাচ্ছে।

দুনিয়ার সব থেকে গণ্যমান্য এই স্পেস এজেন্সির বিজ্ঞানী আর কর্মকর্তারা বছরের পর বছর ধরে এই স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযানটা মহাশুন্যে পাঠানোর জন্য চেষ্টা করছিলেন। অবশেষে, ১৭ অক্টোবর, মঙ্গলবার, সব ঠিকঠাক থাকলে, এইবার পাঁচজন মহাকাশচারী আটলান্টিস স্পেস শাটলে করে ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে গ্যালিলিওর সঙ্গে উড়াল দিবেন। শাট্‌লটা মেক্সিকো উপসাগরের ২৯৫ কিলোমিটার উপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে যেইমাত্র পাঁচ নম্বর কক্ষপথে পৌঁছাবে, সঙ্গে সঙ্গে দলের ক্রুরা তিন-টনি একখানা স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযান মহাশুন্যে ভাসিয়ে দিবেন।

এর একঘন্টা পরে, গ্যালিলিও নিরাপদে শাট্‌ল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযানটার ৩২৫০০ পাউন্ড বুস্টার সিস্টেম জ্বলে উঠবে, আর, নাসার কর্মকর্তারা আগামী ছয় বছর ধরে সৌরজগতের সবথেকে বড় গ্রহটাতে মনুষ্যজাতির তৈরি এই সুনিপুন উদ্ভাবনের ঘুরে বেড়ানো প্রাণভরে দেখতে পারবেন। গ্যালিলিও নিজের প্রয়োজনেই বেশ ঘোরপ্যাঁচের একটা রাস্তা ধরে যাবে। শুক্র আর পৃথিবীর মাঝ দিয়ে অভিকর্ষের চেয়েও দ্বিগুণ শক্তিতে সে গুলতির মতো সাঁই করে চলে যাবে, যাতে বৃহস্পতিতে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট ভরবেগ অর্জন করে নিতে পারে।1

নাসার বাছা বাছা মাথাগুলো বছরের পর বছর ধরে স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযানকে সৌরজগতের মধ্যদিয়ে কীভাবে নিয়ে যাওয়া যায় তাই নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছেন। সৌরশক্তি একটা সম্ভাব্য উপায় হিসেবে প্রথমেই তাদের বিবেচনায় ছিল। তবে, এক্ষেত্রে বৃহস্পতি যদি পৃথিবী থেকে কাছের কোনো গ্রহ হতো তাহলে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু, এটা তো সূর্যের চেয়েও, সঠিকভাবে বলতে গেলে, -৭৭৮.৩ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরের গ্রহ। তাই এভাবে পাঠাতে হলে গ্যালিলিওর আবার বেঢপ সাইজের সোলার প্যানেল থাকা চাই, যাতে সে সূর্যের থেকে অতো দূরে থাকলেও দরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তার যন্ত্রপাতিগুলোকে সচল রাখতে পারে। তাই, শেষমেশ নাসার ইঞ্জিনিয়াররা ঠিক করলেন যে, কোনো প্রাকৃতিক শক্তি নিয়ে ভেবে আর কাজ নাই; এক্কেবারে পারমাণবিক শক্তিই তারা ব্যবহার করবেন।

মহাশুন্যের জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার মোক্ষম জিনিস। জনমানবশুন্য বিরাট মহাকাশে দরকার সামান্য একটু প্লুটোনিয়াম ২৩৮ ডাইঅক্সাইড। কারণ, প্লুটোনিয়াম যে শক্তি ত্যাগ করে সেটুকুই মারাত্মক কেন্দ্রীভূত শক্তি উৎপন্ন করতে পারবে, আর, তার প্রভাবও থাকবে অনেকটা সময় পর্যন্ত। তাই, এটা ব্যবহার করাই সবথেকে যুক্তিযুক্ত। একটা লেড-বাক্সোতে মাত্র ২৪ কিলোগ্রাম প্লুটোনিয়াম ঢালো, তারপর একে ক্ষয়ে ক্ষয়ে আপনাআপনিই উত্তপ্ত হতে দাও; আর, পেয়ে যাও মেশিনটাকে চালানোর জন্য দরকারি বিদ্যুৎ – এক্কেবারে চোখের নিমিষে! ব্যস, এবার গ্যালিলিও আপনিই বৃহস্পতি গ্রহের দিকে দৌড়াতে থাকবে।

আমেরিকার পরমাণু-বিরোধীরা কিন্তু বিষয়টাকে এরকম নজরে দেখল না। তাদের ভাষ্য হল, যা উপরদিকে যেতে পারে তা নিচের দিকে আসারও সম্ভাবনাও নিশ্চয়ই থেকে যায়। তাই, প্লুটোনিয়াম বৃষ্টির সম্ভাবনাটাকেও তারা খুব একটা ভাল চোখে দেখল না। নাসা তাদের এই বলে আস্বস্ত করল যে, গ্যালিলিওর পাওয়ার প্যাক দারুণ নিরাপদ। তারা নাকি এর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পিছনেই ৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছেন। আর সেইসব পরীক্ষায় নাকি প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, যন্ত্রটার জেনারেটরগুলা দারুণ নিরাপদ। কোনো ক্রুটি বা দুর্ঘটনার কারণে মারাত্মক বিস্ফোরণ হলেও সেগুলো নাকি মোকাবেলা করতে পারবে। নাসা সাংবাদিকদের জানাল যে, প্লুটোনিয়াম উচ্ছিষ্টাংশগুলোর ‘বায়ুমন্ডলে অনাকাঙ্খিত অনুপ্রবেশ’ করার সম্ভাবনা ২ মিলিয়নে মাত্র ১ বার। তেমনিভাবে, উৎক্ষেপনের সময় দুর্ঘটনায় প্লুটোনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ারও সম্ভাবনাও ২৭০০ তে ১ বার।

বিরোধীরা এরপরও মানতে চাইলো না। তবে, ভেজাল মেটানোর আধুনিক আমেরিকান রীতি অনুযায়ী তারা তাদের দাবীটাকে নিয়ে তুলল আদালতে। আমেরিকান পরমাণু-বিরোধী আর তাদের শরিক সংগঠনগুলো দাবী করল যে, আমেরিকার ন্যাশনাল এরোনেটিক্স এন্ড স্পেস এডমিনিস্ট্রেশন প্লুটোনিয়াম উচ্ছিষ্ট সংক্রান্ত দুর্ঘটনাগুলোর হিসাব করতে গাফিলতি করেছে। তাই, তারা ওয়াশিংটন ডিসট্রিক্ট কোর্টে এই উৎক্ষেপণ বন্ধের দাবী জানাল। স্থগিতাদেশের আবেদন করা হল, আর সেইসাথে পাল্লা দিয়ে প্রতিরোধও বাড়তে থাকল। এরইমধ্যে, উৎক্ষেপণের মাত্র কয়েকদিন আগে আন্দোলনের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন একটা রায়ও হয়ে গেল। এই রায়ের আসল সময় ধার্য করা হয়েছিল ১২ অক্টোবর।

গণমাধ্যমগুলোর মনোযোগ কেড়ে সপ্তাহ ধরে আন্দোলনকারীদের মহড়া চলল। ক্রমেই পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে লাগল। ৭ অক্টোবর, শনিবার, সাইন-উইল্ডিং কর্মীরা গ্যাস মাস্ক পড়ে রাস্তায় নেমে পড়ল। তারা কেপ ক্যানাভেরালের কাছাকাছি গলিগুলোতে হেঁটে হেঁটে প্রতিবাদ জানাল। ৯ অক্টোবর, সোমবার সকাল ৮টার দিকে নাসা “বৃহস্পতিবার উৎক্ষেপণের” দিনক্ষণ প্রকাশ্যে গুণতে শুরু করল। যেহেতু, দেখা যাচ্ছে আটলান্টিসের ঘড়ি উড়াল দেবার দিনক্ষণ গোণা শুরু করেই দিয়েছে, তাই ফ্লোরিডা কোয়ালিশন ফর পিস এন্ড জাস্টিস এর কর্মীরাও টুরিস্ট কমপ্লেক্সের মধ্যে একটা মহড়া দিয়ে দিল।

নানান কিছিমের প্রতিবাদ ইতিমধ্যেই নাসার হুলুস্থুলু মহাকাশ অভিযানের রোশনাই কিছুটা কেড়ে নিয়েছিল বটে। তবে, এসব কোনোকিছুই তাদের তেমন একটা ভড়কে দিতে পারে নাই। কিন্তু, সত্যিকার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াল, যখন ফ্লোরিডা কোয়ালিশন গণমাধ্যমকে জানাল যে, তারা লোকজন নিয়ে ‘লঞ্চ-প্যাডের দিকে অহিংস কায়দায় এগিয়ে যাবে’।[2] কোয়ালিশনের নেতা ব্রুস গ্যাগনন, খাস বাংলায় যাকে বলে হুমকি দিয়ে বসলেন। তার ভাষ্যে, প্রতিবাদকারীরা হলেন ক্ষীণকায় মানুষ, যারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন বিরাটকায় সরকারি এজেন্সির বিরুদ্ধে। ফাউন্ডেশন অন ইকোনমিক ট্রেন্ডস নামের আরেকটা আন্দোলনকারী গ্রুপের প্রেসিডেন্ট জেরেমি রিভকিন তো ‘জনগণ’ আর ‘নাসার লোকজনকে’ একে অপরের শত্রু বানিয়ে দিলেন। তিনি ইউপিআইকে বললেন, ‘শুধুমাত্র মহাকাশচারীরাই এই অভিযানে সমর্থন দিয়েছে। আর, যারা তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন সেইসব মানুষের কোনো সমর্থন এতে নাই।’[3]

কিন্তু, শুধু প্রতিবাদকারীরাই তো মিডিয়ায় কাজ করেন না। নাসাও জানে গণমাধ্যমগুলোকে কীভাবে সামলাতে হয়। তারা করল কী, তাদের সব রথী-মহারথী মহাকাশচারীদের প্রচারণতার কাজে লাগিয়ে দিল। হাজার হলেও এই মানুষগুলো কিন্তু সাক্ষাত অবতার, পুরো মানবজাতির তরফ থেকে এরা অসম সাহসের সঙ্গে হিমশীতল, নিকষকালো মহাশুন্যে অভিযান করেছেন। আটলান্টিসের কমান্ডার ডোনাল্ড উইলিয়ামস কিন্তু বেফাঁস মন্তব্য করলেন না, তিনি গুটি চালান দিলেন তফাত থেকে। তাঁর ভাষ্য, ‘ছিদ্রান্বেষী লোকজন বহু দেখা যায়, যারা বিষয় নির্বিশেষে চিল্লাপাল্লা করে। অপরিদকে, পতাকা বয়ে নেওয়া কিন্তু সহজ, তবে, সামনে এগিয়ে গিয়ে অর্থবহ কিছু করা সহজ কাজ নয়।’[4]

নাসার মহারথীদের হাতে আরেকটা তুরুপের তাস ছিল। আটলান্টিসের কো-পাইলট মাইকেল ম্যাকুলে শোনালেন অন্য গল্প – আরটিজি রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেক্ট্রিক জেনারেটর — মানে, লেড বাক্সের ওই প্লুটোনিয়ামের উচ্ছিষ্টগুলি — আসলে নাকি ‘কোনো ক্ষতিকর কিছু নয়’। তাই আটলান্টিসের উৎক্ষেপনের সময় তিনি তার ভালোবাসার মানুষদেরকেও স্পেস সেন্টারে নিয়ে আসবেন।

মহাকাশচারীরা হয়তো জীবনবাজী রেখে অভ্যস্থ, কিন্তু, এইরকম একজন মহানায়ক কখনোই তার পরিবারকে নিশ্চিত বিপদের মুখে ফেলার পরিকল্পনা নিশ্চয়ই করবেন না। এছাড়াও, আমেরিকার উপপ্রধানমন্ত্রী ড্যান কয়ালও লঞ্চপ্যাড থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরের কেনেডি স্পেস সেন্টার কন্ট্রোল রুমের ভিতর থেকে উৎক্ষেপন দেখতে স্বশরীরে উপস্থিত থাকবেন বলে তাঁর পরিকল্পনার কথা জানান।

এদিকে নাসাকে যথেষ্ট নির্বিকার দেখা গেল এবং এই ফাঁকে তারা তাদের নিরাপত্তার আয়োজনও বাড়িয়ে দিল। ২০০ নিরাপত্তারক্ষীকে তারা উৎক্ষেপণস্থল পাহারা দিতে নিয়োগ দিল। নাসা দরকারি কোনো আয়োজনই বাকি রাখল না। তাদের বিজ্ঞানীরা বহুকাল ধরে এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করে আছেন। গ্যালিলিওর অগ্রযাত্রা তো আর একদল তথাকথিত ‘উচ্ছৃঙ্খলাকারীদের’ কারণে রুদ্ধ হতে দেওয়া যায় না।

ইতিমধ্যেই বহু দেরি হয়ে গেছে, প্রায় সাতটা বছর। ১৯৭৭ সালেই কংগ্রেস গ্যালিলিও প্রজেক্টের অনুমোদন দিয়েছিল। আর, স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযানটা, যার বাজেট হল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার, সেটাও ১৯৮২ সালে উৎক্ষেপনের কথা ছিল। কিন্তু, নানা কারণে তখন থেকেই সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

১৯৭৯ সালেই নাসা এই উৎক্ষেপণ শাটল উন্নয়নজনিত সমস্যার কারণে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় । গ্যালিলিওকে তখন ‘স্প্লিট লঞ্চ’ করানোর কথা ভাবা হয়েছিল। এর মানে হল, মূল মহাকাশযান আর স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযান দুটোকেই মহাশুন্যে পাঠানোর জন্য দুইটা আলাদা আলাদা শাট্‌ল উৎক্ষেপন করা হবে। কিন্তু, ১৯৮১ সালে এর ব্যয়ভার বেড়ে যাওয়ায় নাসা এই পরিকল্পনায় বড়সড় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। তারা গ্যালিলিওর জন্য পূর্বপরিকল্পিত তিন-স্তরী বুস্টার সিস্টেম নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেয়। তার বদলে তারা অন্য আরেক সিস্টেমের কথা চিন্তা করে এবং উৎক্ষেপনের সময় পিছিয়ে ১৯৮৫ সাল ধার্য করে। ফেডারেল বাজেট কর্তন করা হলে ১৯৮১ সালে গ্যালিলিওর বুস্টার সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামকে বাঁচাতে নাসা উৎক্ষেপণের সময় আরেক দফা পিছিয়ে ১৯৮৬ সালের মে মাসে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৮৬ সালে চ্যালেঞ্জার বিপর্যয়ের পর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নাসা গ্যালিলিওর বুস্টার সিস্টেমে পরিবর্তন আনার দিকে নজর দেয়। এর ফলে উৎক্ষেপন আরেক দফা পিছিয়ে যায়।

এবার দুই পর্যায়ে বিভক্ত সলিড ফুয়েল আইইউএস সিস্টেমকেই সবথেকে উপযুক্ত উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হল। কিন্তু, সমস্যা একটাই। এই সিস্টেম গ্যালিলিওকে বড়জোড় মঙ্গল বা শুক্র পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবে, কিন্তু, স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযানটি বৃহস্পতিতে পৌঁছানোর বহু আগেই তার সমস্ত জ্বালানী শেষ হয়ে যাবে। তখন নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির রজার ডিয়েল একটা ভালো বুদ্ধি দিলেন। গ্যালিলিওকে কাছাকাছি কয়েকটা গ্রহের চারপাশে কয়েকবার ঘুরিয়ে নিলে স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযানটি সামান্য একটু অভিকর্ষজ কর্মশক্তি অর্জন করে নিবে। এরপর একে বৃহস্পতির দিকে ছুঁড়ে দিতে হবে। গ্যালিলিওর ‘ভিগা’ আবক্রপথ -শুক্র-পৃথিবী-পৃথিবী-অভিকর্ষ-শক্তি অর্জন – এইসব ধাপ অতিক্রম করে মহাকাশযানটির বৃহস্পতিতে পৌঁছাতে অতিরিক্ত তিন বছর ব্যয় হবে, তবে, এই পদ্ধতিতে শেষপর্যন্ত তা অবশ্যই গন্তব্যে পৌঁছাবে।

পরমাণু-বিরোধী আন্দোলনকারীরা এতে আপত্তি তুলে জানাল যে, পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে গেলে পারমাণবিক দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। ‌কিন্তু, নাসার ভাষ্য, অভিকর্ষজ শক্তি অর্জনের জন্য এটুকু ঝুঁকি নিতেই হবে।

আরও একটা কারণে গ্যালিলিওর উৎক্ষেপণ আরও একদফা পেছাতে হয়েছিল। ৯ অক্টোবর, সোমবারে, নাসা জানায় যে, শাট্‌ল নম্বর ২ এর প্রধান ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণকারী কম্পিউটারে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। ঘটনা সত্য, তবে সমস্যাটা ছিল আটলান্টিসে, গ্যালিলিওতে নয়। সামান্য কারিগরি সমস্যা হলেও কথা ছিল, কিন্তু, এক্কেবারে ইঞ্জিন কম্পিউটারের সমস্যা। কাজেই একে মামুলি কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নাই, বিশেষ করে যখন ওদিকে পরমাণু-বিরোধীদের আদালতপাড়ার নাটকটা চলছে।

এরকম অবস্থায় নাসার প্রকৌশলীরা আন্ত-রাষ্ট্রীয় টেলিকনফারেন্সে বসে বিষয়টা নিয়ে বিতর্ক করলেন। একে ঠিক করতে গেলে উৎক্ষেপন আরও কিছু ঘন্টা পিছিয়ে যেতে পারে। হয়তো এক-দুইদিনও লেগে যেতে পারে। আর, গ্যালিলিওর হাতে অতো সময় নাই। কারণ, বিভিন্ন গ্রহের বিভিন্ন কক্ষপথের ভিন্নতার কারণে মহাকাশযানটিকে অবশ্যই ২১ নভেম্বরের মধ্যে রওনা দিতে হবে। আটলান্টিস যদি এর মাঝে টেকঅফ না করে, গ্যালিলিওকে তাহলে উৎক্ষেপনের জন্য আরও ঊনিশ মাস অপেক্ষা করতে হবে। এই প্রকল্পে ইতিমধ্যেই মূল বাজেট ৪০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়ে গেছে। অতিরিক্ত দেড় বছরের জন্য আরও ১৩০ মিলিয়ন বা তারও বেশী অর্থ ব্যয় হয়ে যাবে। তাই, পুরো প্রকল্পটাই বাতিল হয়ে যাওয়ার একটা জোড়ালো সম্ভাবনা আছে। তাই, গ্যালিলিওর জন্য এবার হয় করো, নয়তো মরো মার্কা অবস্থা।

ঘন বৃষ্টিতে লঞ্চপ্যাডে ১০০ মিলিমিটার এবং মেলবোর্ন ও ফ্লোরিডায় ১৫০ মিলিমিটার পানি জমা সত্ত্বেও সময় গণনা যথারীতি চলছিল; অন্তত তখন পর্যন্ত। নাসা শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিল। উৎক্ষেপন পাঁচদিন পিছিয়ে ১৭ অক্টোবর ধার্য করা হল, যাতে এর মাঝে কম্পিউটারের সমস্যা সমাধান করা যায়।

গ্যালিলিওর সাথে যেসব বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলী শুরু থেকেই ছিলেন তাদের নিশ্চয়ই সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, ভাগ্য নিতান্তই গ্যালিলিওর প্রতি সহায় নয়। যেন কোনো এক দুর্বোধ্য কারণে, দুনিয়ার সমস্ত শক্তি, বিশেষ করে পৃথিবীর সমস্ত শক্তি যেন মানুষের বৃহস্পতি গ্রহটাকে জয় করার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। নাসা যেইমাত্র একটা সমস্যার সমাধান করে, ওমনি একটা অদৃশ্য হাত যেন আরেকটা সমস্যা  ছুঁড়ে দেয়।

[1] গ্যালিলিও এবং তার উৎক্ষেপণের বেশকিছু বর্ণনায় আমি অনেকগুলো তারবার্তার উপর নির্ভর করেছি, বিশেষ করে ইউপিআই সায়েন্স রিপোর্টার উইলিয়াম হারউড এর বার্তার উপর।

>[2] William Harwood, ‘NASA Awaits Court Ruling on Shuttle Launch Plans’, UPI, 10 October 1989.

[3] William Harwood, ‘Atlantis “Go” for Tuesday Launch’, UPI, 16 October 1989.

[4] Ibid

  1. মূল ব্যানারে ‘Officially’ বানানটা ভুল ছিল